আমরা আসলে কি চাই
- AbuSayed Mahfuz
- Aug 16
- 5 min read
উক্তিটি সম্ভবত কবি রবীন্দ্রনাথের।
বিখ্যাত এই উক্তিটাকে হয়তোবা এভাবেও বলা হয়েছে ঃ
“যাহা চাই ভুল করে চাই, বা আমি যাহা চাই দেরী করে চাই। আর যাহা পাই তাহা ভাল করে নেই না।”
বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষের সময় কবি রফিক আজাদ ”ভাত দে হারামজাদা” নামে একটা কবিতা লেখার কারনে তদানিন্তন সরকার কর্তৃক কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। এই কবিতার অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল, তিনি লিখেছিলেন, অনেকে অনেক কিছু চায়, টাকা পয়সা, ধন দেীলত, বাড়ী গাড়ী, সুন্দরী নারী। আমি এর কিছুই চাইনা, আমি শুধু চারটি ভাত চাই। মাছ গোশত, তরকারি, পোলাও, কোর্মা কিছুই চাইনা। চাই শুধু চারটি ভাত।
কবি সুকান্ত অভাবের তাড়নায় লিখেছিলেন, ”ক্ষুধার জ্বালায় পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
আমরা আসলে কি চাই এই পৃথিবীতে? আমাদের জীবনের লক্ষ্যই কি?
আমরা অনেকেই ঐ গানটা জানি ”দুনিয়াটা মস্ত বড়, খাও দাও ফুর্তি করো, আগামীকাল বাঁচবে কিনা বলতে পারো...” কি পেলাম তাহলে... খাওয়া দাওয়া আর ফুর্তি করাই জীবনটার আসল লক্ষ্য।
অন্য একটি সংজ্ঞা আমরা পাই এভাবে। একটি কবিতার পংতিতে, “যেদিন তুমি এসেছিলে ভবে,
কেঁদেছিলে তুমি, হেসেছিল সবে।
এমন জীবন তুমি করিবে গঠন।
মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।”
এমন জীবন আমরা চাই যে জীবন ভরে থাকবে পরপোকারে। যে জীবনে
আমার মৃত্যুর পর মানুষ আমাকে স্মরণ করবে।
এরপর আমরা আরেকটি সংজ্ঞা পাই পবিত্র কোরআন থেকে। ”বল আমার প্রার্থনা (সালাত), আমার ত্যাগ, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু সবকিছুই আল�াহর নামে উৎসর্গীকৃত।”
পবিত্র কোরআনের উপরোক্ত বাণীর মধ্যে আমরা বুঝতে পারি যে একজন মানুষের জীবনের সবকিছুই উৎসর্গীকৃত। তার নিজের বলতে কিছুই নেই।
বিখ্যাত শিখ গুরু কারপাল শিং জীবনের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে ঃ
"ঙহব সধু ধপয়ঁরৎব ষড়াব ভড়ৎ ধষষ, ংবব ঃযব ৎবভষবী ড়ভ ঃযব ঁহরাবৎংব রিঃযরহ ড়হব'ং ড়হি ংবষভ ধহফ ঃযধঃ ড়ভ ড়হব'ং ংবষভ রহ ধষষ ড়ঃযবৎং, ধহফ ৎবধষরুব ঁষঃরসধঃবষু ঃযব ঢ়ৎরহপরঢ়ষব ড়ভ ঃযব ভধঃযবৎযড়ড়ফ ড়ভ এড়ফ ধহফ ঃযব নৎড়ঃযবৎযড়ড়ফ ড়ভ সধহ......
ঞযবংব ধৎব, রহ ঃযব সধরহ, ঃযব ঃযৎবব ঢ়ধঃযং, ড়ৎ ৎধঃযবৎ ঃযৎবব ধংঢ়বপঃং ড়ভ ধহ রহঃবমৎধঃবফ ঢ়ধঃয ড়ভ যবধফ, যবধৎঃ ধহফ যধহফ, যিবৎবনু ড়হব সধু ধপযরবাব ঃযব ফবংরৎবফ বহফ, ঃযব ঁহরড়হ ড়ভ ংড়ঁষ রিঃয ঃযব ঙাবৎংড়ঁষ."
ঞযব ঈৎড়হি ড়ভ খরভব, ঝধহঃ করৎঢ়ধষ ঝরহময
কারপাল সিংহের সংজ্ঞায় কিছু বিষয় ফুটে উঠেছে যা পবিত্র কোরআনের ভাষায়ও আমরা দেখতে পাই। আর তাহলো রহঃবমৎধঃবফ ঢ়ধঃয ড়ভ যবধফ, যবধৎঃ ধহফ যধহফ
যেটাকে সহজ ভাষায় বলা যেতে পারে মানুষের মেধা, আতœা এবং হাতের সমন্বয় সাধনই হলো মানুষের জীবনের লক্ষ্য। মেধা হলো বিবেক বা বুদ্ধি, আতœা হলো হৃদয় এবং মন আর হাত হলো কর্ম, আমাদের চালচলন।
এবার একটু বাস্তবতার আলোকে দেখা যাক আমরা আসলেই কি চাই। আমাদের জীবনের লক্ষ্য উদ্দেশ্যই বা কি?
আমরা টাকা চাই, পয়সা চাই, ডলার, দামী গাড়ী, বাড়ী, সুন্দরী নারী। সবকিছু চাওয়ার পেছনে মূলত আমরা একটাই চাই। আমরা সুখী হতে চাই।
দার্শনিকরা বলে থাকেন, পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো ঝগড়া, ফাসাদ, মারামারি, যুদ্ধ বিগ্রহ হয়েছে এর সবগুলোই ৩টি বিষয় বা এই ৩টির যে কোন একটিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। (১)অর্থ (২)ক্ষমতা (৩) নারী
মনস্তাত্বিকভাবে এই তিনটি জিনিস চাওয়ার পেছনে মূলত একটি চাওয়াই মূখ্য। আর তা হলো সুখী হওয়া। মানুষ আসলে চেতন কিংবা অবচেতন মনে সুখী হতে চায়। সুখ পেতে চায়। পার্থক্য হলো সুখের সজ্ঞায় এবং সুখ পাওয়ার পদ্ধতিতে।
বিভিন্ন ব্যাক্তি বিভিন্ন জিনিসকে সূখ মনে করে।
আমাদের জীবনের এই চাওয়া পাওয়াটা অনেক সময় খুবই জটিল হয়ে পড়ে। মানুষ অনেক সময় নিজেই জানেনা সে আসলে কি চায়। তাছাড়া চাওয়ার পদ্ধতিতেও ভুল থেকে যেতে পারে। যাহা চাই তা কিভাবে চাই ঃ
১. যাহা চাই তাহা চাই নাঃ
এক্ষেত্রে প্রথম কথা হলো আমরা যা চাই বলে ভাবি বা প্রকাশ করি আসলেই কি তা চাইছি? হয়তোবা আমি যা চাই বলছি তা না চেয়ে অবচেতন মনে চাইছি অন্য কিছু।
মানুষের মনের তিনটি অবস্থান আছে। (১)চেতন (২) অবচেতন (৩) অচেতন। অনেক সময়ই আমাদের চেতন মন যা চায় অবচেতন মন হয়তো তা চায় না। কিংবা অবচেতন বা অচেতন মন যা চায় চেতন মন তা জানেই না। অন্য অর্থে বলা যায় আমরা (আমাদের চেতন মনে) জানিই না আমরা (আমাদের অবচেতন মনে) আসলে কি চাই।
মনে করুন একজন লোক কোটিপতি হতে চায়। তাহলে প্রশ্ন করা যেতে পারে ব্যাক্তিটি আসলে কেন কোটিপতি হতে চায়। বড় নেতা হতে চায়।
এ প্রসঙ্গে সেই ব্যাক্তির উদাহরণ টেনে আনা যেতে পারে যে, এক ব্যাক্তি বাজারে গিয়ে ঘোড়া মার্কা ছাতা খোঁজ করছে। কোথাও পাচ্ছে না এবং সকল দোকানদার তাকে ঘোড়া মার্কা ছাতা নেই বলে বিদায় দিয়ে দিচ্ছে। এক দোকানদার ছিল বুদ্ধিমান, তিনি লোকটাকে কথাচ্ছলে দোকানে বসালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন তিনি আসলেই কি চান। তিনি কি আসলেই ঘোড়া মার্কা ছাতা কিনতে চান? নাকি তিনি খুব ভাল ছাতা কিনতে চান। তাছাড়া এই বুদ্ধিমান দোকানী এই ক্রেতার কাছ থেকে আরো জেনে নিলেন যে তাঁর ছাতা কেনার লক্ষ্যটা কি? রঙবেংয়ের বাহারী ছাতা চান নাকি ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য বড় আকারের কালো রংয়ের ছাতা কিনতে চান।
ডেল কার্নেগীর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে যে, ”মানুষ আসলে কেউ কিছু কিনে না বা কিনার দরকার নাই মানুষ শুধু তার প্রয়োজন পুরণ করতে চায়।”
আপনি এক গ�াস পানি কিনতে যান কেন, কারণ আপনার পানি প্রয়োজন। প্রয়োজন না হলে আপনি বিনা পয়সায় দিলেও পানি বহন করতে যাবেন না, আবার প্রয়োজন হলে আপনি এক ডলারের একটি পানির বোতল ১০০ ডলার দিয়েও কিনতে রাজী হবেন।
তেমনিভাবে একজন মানুষ কেন কোটিপতি হতে চায়, ডাক্তার হতে চায় আইনজীবি হতে চায়। আসলে চাওয়া গুলোর পেছনে মানুষ আসলে যেটা চায় সেটা হলো মানুষ চায় সুখী হতে, মানুষ শক্তি চায়। মানুষ বুঝাতে চায় আমি অন্যের চে’ ভাল, শক্তিশালী। আর মানুষ মনে করে শক্তিটা আসে ডলারের মাধ্যমে সে জন্যই এই ডলারের জন্য এত কিছু। যদি সে কোন কারণবশতঃ এই ডলার মূল্যহীন হয়ে পড়ে তখন কিন্তু কোন মানুষ আর ডলারের পেছনে দেীড়াবে না।
অর্থাৎ আমরা যে কোটিপতি হতে চাই তাতে কিন্তু আমরা আসলে কোটিপতি হতে চাই না এক্ষেত্রে অবচেতন মনে আমরা আসলে চাই শক্তি, আরো গভীরে গেলে বলা যায় আমরা আসলে সুখ পেতে চাই।
আর সুখ পাবার পদ্ধতিটা কি সেটাই নিয়েই যত গন্ডগোল।
২. যাহা চাই ভুল করে চাই ঃ
দ্বিতীয় যে বিষয়টা সেটা হলো আমি যা চাই আমার চাওয়াটা ঠিক আছে, অর্থাৎ আমি যাহা চাইছি তাহাই চাইছি তবে আমি যেভাবে চাইছি সে পদ্ধতিটা ঠিক নয়।
এখানে একটি মর্মান্তিক বিষয় জড়িত। যে বিষয়টাকে অধিকাংশ মানুষ সুখ মনে করলেও যেটা মানুষকে শুধু দুঃখই দেয়। এটাই সৃষ্টি রহস্যের অন্যতম দিক। সেই মর্মান্তিক বিষয়টা হলো, অধিকাংশ মানুষই সুখটা চিন্তা করে আপেক্ষিকতার বিচারে, বা নিজকে অন্যের চে’ বেশী বা ভাল এটা প্রদর্শনের দৃষ্টি ভঙিতে।
অধিকাংশ ধর্ম বিশেষত কোরআন এবং বাইবেলের দৃষ্টিতে শয়তান বা ইবলিস অভিশপ্ত হবার প্রধান বা একমাত্র কারণ ছিল সে বলেছিল ”আমি আদমের চে’ শ্রেষ্ঠ।”
মানুষ বিলাস দ্রব্য ব্যাবহারের পেছনে কিন্তু এই প্রর্দশনেচ্ছাটাই মূল কারণ। আমার বাড়ী এ পাড়ার সবচে’ দামী বাড়ী। আমি সবার চে’ দামী গাড়ী চালাই। আমি সবার মত নই, আমি সবার চে’ ভাল। কথায় আছে সুন্দরী মেয়েরা অহংকারী হয়। কারণ যখন সব পুরুষরা তার দিকে তাকায় তখন স্বভাবতই সবসময় তার মধ্যে অসাধারণ আতœপ্রত্যয় জন্মে যখন এই প্রত্যয়ের বাস্তবতা না আসে তখন তারা আবার হতাশও হয়।
কাড়ি কাড়ি অর্থ জমানোকে কেউ সুখ মনে করে। কম বেশী পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেকটি মানুষ মনে করে অর্থই সুখ দিতে পারে। যদিও এই মানুষই আবার বলে “অর্থই সকল অনর্থের মূল“। অর্থটা হলো আসলে বস্তু। অর্থই সকল সুখ দিতে পারে এটা মনে করার প্রধান বা একমাত্র কারন হলো এই অর্থ দিয়েই পৃথিবীর প্রায় সব ’বস্তু’ কেনা যায়। তবে মজার ব্যাপার হলো অর্থ দিয়ে পৃথিবীর প্রায় সকল বস্তু কেনা গেলেও মানুষের জীবনের চেতন, অচেতন এবং অবচেতন মনের একমাত্র চাওয়া সুখ কিন্তু কিনতে পাওয়া যায় না। আর এটাই হলো রহস্য। এই রহস্যকে ঘিরে চলছে সারা পৃথিবী।
এই বিষয়টা এতই রহস্যময় যে এটা একটা মরিচীকার মত। অর্থাৎ এটা দেখেও দেখা যায় না, বুঝেও বুঝা যায় না। বিষয়টা এতটাই আবহ বা অস্পষ্টের মত যে, মানুষ বুঝেও তা বুঝতে পারে না। এর প্রধান কারণ হলো পৃথিবীটা কিন্তু চলছে বস্তু কেন্দ্রিক।
২. যাহা চাই দেরী করে চাই ঃ
তৃতীয় যে বিষয়টা তা হলো মানুষ যা চায় সেই চাওয়াটা ঠিক আছে। অর্থাৎ সে যা চাইছি চেতন কিংবা অবচেতন মনে ঠিক তাই চাইছে, এবং যেভাবে চাইছে সে চাওয়ার পদ্ধতিও ঠিক আছে। কিন্তু সমস্যা হলো সময়ের, অর্থাৎ সঠিক সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। চাওয়াটা যদি বৈধও হয়, চাওয়ার পদ্ধতিটাও যদি ঠিক হয় কিন্তু সময়টা যদি ঠিক না হয় তাহলেও সবকিছু গোলমেলে হয়ে যেতে পারে।
কথায়




Comments