ইসলাম এবং রাজনীতিঃ সংকট এবং সম্ভাবনা ৪
- AbuSayed Mahfuz
- Aug 16, 2025
- 8 min read
ইসলাম এবং রাজনীতি। এ বিষয়টা যে শিরোনামেই আলোচনা করা হোকনা কেন, আলোচনায় যে প্রশ্নটা প্রধান এবং অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে সেটা হল ইসলামী রাজনীতির সাথে পাশ্চাত্যের দেয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মিল বা বেমিল কি? ইসলাম কি গণতন্ত্রকে সমর্থন করে? ইসলামী নির্বাচনী পদ্ধতি কি?
ইসলাম একটি সম্পূর্ণ জীবন বাবস্থা। ইসলামে ব্যাক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নীতিমালা অবশ্যই আছে। ইসলামের প্রায় পনেরশত বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্র শাসনের ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতা আছে। আজকের যুগে যেমন এক, দুই বা তিন পরাশক্তি রয়েছে এক সময়, ইসলাম বা মুসলমানরাই এ পরাশক্তির কেন্দ্র বিন্দু ছিল। বেশি দূরে যাবার দরকার নাই, কোন ধর্ম তত্ত্ব পড়ার দরকার নাই, কোরান হাদিস কিংবা কোন ধর্ম গ্রন্থ ও খোলার দরকার নাই, আমরা যদি প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ এবং এর পূর্ববর্তী ইতিহাস দেখি অনেক কিছুই দেখতে পাব। উমাইয়্যাহ শাসন, আব্বাসিয় শাসনের যুগ, ফাতিমিদের শাসনের যুগ,
আজকের যে সভ্যতা তাঁর গোড়া পত্তনে মুসলমানদের বিশেষ ভূমিকা ছিল এবং আছে। মুসলিম গণিতবিদ আল জাবের থেকে আল জেবরা বা বীজ গণিত, ক্যালকুলাস থেকে শুরু করে তথা ইঞ্জিনিয়ারিং মুসলমানরা যে পত্তন করেছে সেটা কোন অন্ধ বধির ও অস্বীকার করতে পারবে না। ইতিহাসবিদ ইবনে ইসহাক, পদার্থবিদ, গণিতজ্ঞ আল বিরুনি, আল খাওয়ারজমি, আল কিনদি, ইবন খালদুন, ইবনে খালদুন, ইবন আল হাইথাম বা আল হাযেন এদের নামকে মুসলিম নাম থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য কাত চিত গাল বাঁকা করে যেভাবেই উচ্চারণ করা হয়না কেন, আধুনিক বিজ্ঞান এবং সভ্যতার গোড়া পত্তন এসব মুসলিম মনিষীরাই করেছিলেন এ ব্যাপারে কোন এ বিষয়ে কিছুই জানেনা এমন মূর্খ ছাড়া কোন অন্ধ, বধির বা মিথ্যুক ও অস্বীকার করতে পারবে না। এ ব্যাপারে কারো কোন দ্বিমত নাই বা থাকতে পারে না।
কিন্তু প্রশ্ন হল, মুসলিম মনিষীরা অতীতে যে অবদান রেখেছিলেন সেটাই কি রাজনীতি ছিল? ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনার যে নীতিমালা দেয়া হয়েছে, কিংবা অতীতে মুসলিম শাসক রা, কিংবা উমাইয়া আব্বাসিরা কিংবা মোঘলরা যে নীতিমালা অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন সেটাকেই কি আমরা ইসলামী রাজনীতি বলবো? এ প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। তবে এ প্রশ্নের কাঠিন্য শুধু ইসলামের সাথে ট্যাগ লাগার কারণেই নয়।
এমনকি পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেও আমরা নানা মত, পথ দেখি। আমরা যদি ইসলাম পূর্ব এমন আধুনিক যে কোন সভ্যতা পূর্ব ইতিহাস দেখি, রাজনীতির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে সক্রেটিস, এরিস্টটলে, কিংবা প্ল্যাটো কি বলেছেন। জন হবস লক বা জুডিও খ্রিস্টীয় রাজনৈতিক দর্শন দেখি সেখানে নীতি নৈতিকতা, সাম্য, সম অধিকার ইত্যাদি নৈতিক বিষয়গুলি দেখি। পাশ্চাত্যে আমরা, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স বিভিন্ন দেশে ভিন্ন রকম গণতান্ত্রিক প্রথা দেখি। খোদ আমেরিকাতেও এটা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আমেরিকাতে বিতর্ক চলছে ইলেক্টরাল কলেজ পদ্ধতি নিয়ে। আমেরিকাতে প্রতি ১০ বছর পর আদম শুমারি হবার পর ইলেক্টরাল কন্সটিটিউন্সি গুলো রি ডিস্ত্রিক্টিং হয় সেটা নিয়ে চলে চরম চাতুর্য এবং রাজনীতি। ভোট পদ্ধতিতে এবসেন্টি ব্যালট নিয়ে চলে আরেক ধরনের রাজনীতি।
রাজনীতিটা আসলেই একটা জটিল অংক। রাজনীতি কখনোই সরল অংক ছিলনা। রাজনীতি মানেই চাতুর্য, ভাঁওতাবাজি, প্রতারণা, মিথ্যার আশ্রয় নেয়া ইত্যাদি অনৈতিক বিষয়গুলো। অপরদিকে আমরা দেখি ম্যাকিয়াভ্যলিজম।
আমেরিকাতে আমরা ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং রিপাবলিকান পার্টির রাজনীতির মধ্যে বিস্তর তফাত দেখি। শুধু ডেমোক্রাট আর রিপাবলিকান নয়, জীবনে কোনদিন রাজনীতি করেন নি, কোন নির্বাচন করেন নি, কোন নির্বাচনে জেতেন নি, সে ডোনাল্ড ট্রাম্প হঠাৎ এসে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে শুধু নির্বাচিতই হন নি, আমেরিকার ইতিহাসে নতুন এক রাজনীতির জন্ম দিয়েছেন। কেউ অস্বীকার করতে পারবেনা এটাও রাজনীতির একটা ধারা।
১১ জুলাই ২০২১, টেক্সাস রাজ্যে হারভিস রজার নামে একজন ভোটারকে অবৈধভাবে ভোট দেবার অপরাধে গ্রেফতার করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু অপরাধ কি ছিল রজারের? রজারের অপরাধ ছিল, তিনি আইনে সাজা প্রাপ্ত অবস্থায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন। টেক্সাসের আইনে সেটা অপরাধ। এবং এই সামান্য অপরাধের জন্য টেক্সাসের আইনে তার ২০ বছরের ও হতে পারে। (দ্রষ্টব্য টেক্সাস ট্রিবিউন, জুলাই ১১, ২০২১)
ইসলামী প্রবক্তাদের মধ্যে যারাই রাজনীতির কথা বলেছেন বলতে গেলে সবাই পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে সমালোচনা করেছেন এবং প্রত্যাখ্যন করেছেন। কেউ কেউ মাঝামাঝি নতুন পদ্ধতির কথা বলেছেন। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ডঃ মাহাথির মুহাম্মাদ, স্বভাবতই তিনি কোন ইসলামী দলের নেতা নন, কিংবা তিনি নিজে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করেন বলে দাবী করেন না, তবে তিনি মুসলিম বিশ্বের পরিচিত মুখ, এবং মুসলিম মানবাধিকারের অগ্র সেনা, এবং পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক কিছু কিছু পদ্ধতির সমালোচক। মাহাথির মোহাম্মাদ গণতন্ত্রকে প্রত্যাখ্যান করেন নি তবে তিনি মনে করেন, প্রতিটি দেশ এবং জাতীর নিজস্ব গণতান্ত্রিক পদ্ধতি আছে। কোন পদ্ধতি কোন সমাজে কিভাবে কাজ করবে সেটা সে সমাজের মানুষ খুঁজে বের করবে বা ভেবে দেখবে। ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর, জাতিসঙ্ঘ সাধারণ সভা থেকে ফেরার পথে লন্ডনের চাটহাম হাউজে দেয়া এক বক্তব্যে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের সমালোচনা করে বলেন, “অনেক সময়ই নির্বাচনের পর বিজয়ী এবং বিজিত পক্ষ ঝগড়া ঝাটি মারামারি, সংঘাত এমনকি কি গৃহ যুদ্ধেও লিপ্ত হয়। এমন পরিস্থিতিতে অনেক দেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রেও পরিণত হতে পারে।“
(দ্রষ্টব্যঃ THE TIMES, LONDON, UK, OCTOBER 2, 2018)
2019 ২০১৯ সালে ডক্টর মাহাথির মোহাম্মাদ কম্বোডিয়ায় রয়াল ইউনিভার্সিটি অফ নমফেন এ দেয়া এক বক্তব্যে পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের অন্ধ অনুকরণের সমালোচনা করে বলেন, ‘নম ফেন’ কম্বোডিয়া তাঁদের নিজ দেশে জুতসই এবং প্রযোজ্য এমন পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রকেই গ্রহণ করা উচিৎ। মাহাথির বলেন, পৃথিবীটা ছোট হয়ে আসছে, আমরা একে অপরের খুব কাছে চলে আসছি। এজন্য আমরা একে অপর দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি এবং হব, এ জন্য আমরা প্রত্যেকেই আমাদের নিজেদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, সভ্যতা নিয়ে গর্ব বোধ করা উচিৎ। (দ্রষ্টব্য খেমার টাইমস ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, )
আধুনিক কালের বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ, পাকিস্তানের বিচারপতি মুফতি তকি ওসমানী তাঁর বিখ্যাত বই “ইসলাম আওর সিয়াসি নাজরিয়াত” বইতে পাশ্চাত্যের অন্যন্য মতবাদের সাথে গণতন্ত্রের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি গণতন্ত্র তথায় তাঁর ভাষায় উর্দুতে জমহুরিয়ত কে বিশেষ ভাবে সমালচনা করেছেন এবং কেন তিনি বিশেষভাবে পাশ্চাত্যের গনতন্ত্রের সমালোচনা করছেন তাঁর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন যে আমাদের সবাইকে এর ক্ষতিকর দিকগুলো জানা দরকার এ জন্য যে, আজকের যুগে পাশ্চাত্যের এই গণতন্ত্র আজকের যুগের মূল মন্ত্র হয়ে পড়েছে।
মুফতি তকি ওসমানী যে ফ্যক্টরগুলো গণতন্ত্রে ভূমিকা রাখে এবং তাঁর দৃষ্টিতে গণতন্ত্রকে প্রভাবিত করে এবং কি কারণে এবং কিভাবে ক্ষতি করে সে বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন। যেমন ইন্টারেস্ট গ্রুপ, প্রেসার গ্রুপ, রাজনৈতিক দল এবং গ্রুপ ইত্যাদি। তকি ওসমানী নির্বাচন পদ্ধতিরও সমালোচনা করেছেন। মুফতি ওসমানী তাঁর এই বইয়ের ১৪৫ নম্বর পৃষ্ঠায় একটি সন্দর যুক্তি পেশ করেছেন যে আধুনিক যুগে মানুষ গণতন্ত্রের প্রতি এত বেশি ঝুঁকে পড়ার কারণ হল মানুষের কাছে এর চেয়ে ভাল কিছু উপস্থাপন করা হয়নি, বরং পাশ্চাত্যের এই গণতন্ত্র আসার আগে মানুষ স্বৈরাচার, এবং রাজতন্ত্রের নিপীড়নে পিষ্ট ছিল। যে সময় গণতন্ত্র বাণী শোনান হয়েছিল সে সময় সে বাণী মানুষের কাছে মধুর লেগেছিল। কেউ গণতন্ত্রের খারাপ দিক চিন্তা করে দেখেনি।
মুফতি তকি ওসমানি একই বইয়ের ১৪৬ পৃষ্ঠায় আবরাহাম লিঙ্কনের সেই বিখ্যত উক্তি
“Government of the people, by the people, for the people” অর্থাৎ
“সরকার হল জনগণের মধ্য থেকে, জনগণ দ্বারা এবং জনগণের জন্য“ মুফতি ওসমানী বলেন যুক্তির দৃষ্টিতে আব্রাহাম লিঙ্কণের এই স্লোগান ভুল তিনি বলেন আব্রাহাম লিঙ্কনের এই বক্তব্যের অর্থ হল, জনগণ নামের একই বাক্তি শাসক আবার সেই একই ব্যাক্তিই শাসিত, এবং সে জনগণকে আবার ক্ষমতার উৎস বলা হয়েছে, মুফতি ওসমানী বলেন এই কথাটা যৌক্তিক নয়।
তিনি “জনগণের শাসন” নামক পরিভাষার সমালোচনা করে বলেন, আসলে জনগণের শাসন এই কথার অর্থ হল এই যে, জনগণ নামক কিছু ব্যক্তি এক দিকে নিজে নিজের ইচ্ছা খুশি মত যা ইচ্ছা করে, এবং জনগণের শাসনের নাম দিয়ে নিজেকে নির্বাচিত করে নিজের খুঁটি শক্ত করে নেয়, অন্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই প্রতিনিধি শাসক হয়ে পড়েন এবং অন্য জনগণ শাসিত এবং শোষিত হয়ে পড়েন।
(দ্রষ্টব্যঃ ইসলাম আওর সিয়াসি নজরিয়াত, মুফতি মোহাম্মাদ তোকি ওসমানী, মাক্তাবা মা’আরিফ আল কুরআন, করাচী পৃষ্ঠা ১৪৫, ১৪৬)
ইসলামী গবেষক এবং চিন্তাবিদের মধ্যে মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদি ইসলামী রাজনীতির সবচেয়ে প্রসিদ্ধ প্রবক্তা ছিলেন, এবং ইসলামী রাজনীতি এবং এর কাঠামো নিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছেন তিনি। মাওলানা মওদুদির সার্বিক রচনা এবং বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি চেয়েছেন পূর্ণ সামাজিক বিপ্লব। সমাজ পরিবর্তন। আদর্শের কার্যকর স্বাভাবিক বিপ্লব।
তিনি পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রের সমালোচনা করেছেন তবে তিনি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি অবলম্বনের প্রস্তাব করেছেন। তিনি এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একটি আন্দোলনের প্রয়জনীয়তার কথা প্রস্তাব করেছেন। মাওলানা মওদুদি এ প্রসঙ্গে বলেন, “যাঁদের বুনিয়াদ নির্মিত হবে সেই জীবন দর্শন, সেই জীবনোদ্যেশ্য। তাঁরা তাঁদের তাঁদের আদর্শের উপর ভিত্তি করে একটি শিক্ষা ব্যাবস্থা প্রতিষ্ঠা করবে। বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব (Intellectual Leadership ) তৈরি করবে। যা থেকে সৃষ্টি মুসলিম বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, অর্থনীতিবিদ, আইনজ্ঞ, রাজনীতিবিদ, মোটকথা জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় এমন সব বিশেষজ্ঞ তরি হবে, রারা নিজেদের মন মানসিকতা, ধ্যান, ধারনা ও চিন্তা দর্শনের দিক থেকে হবে পূর্ণ মুসলিম। “
(দ্রষ্টব্যঃ উর্দু ইসলামী হুকুমত কিস তারাহ কায়েম হুতি হায় (إسلامي حكومت كس طرح قايم هوتي هي ) সাইয়েদ আবুল আলা মাওদুদি, দফতরে রিসালাত, তারজুমানুল কুরআন, দারুল ইসলাম পাঠান কোট, উর্দু বই পৃষ্ঠা ১৬; বাংলা অনুবাদ “ইসলামী বিপ্লবের পথ, আব্দুস শহীদ নাসিম, পৃষ্ঠা ১৭)
মাওলানা মওদুদি আরও বলেন “এই বিশেষ কর্মনীতি ও কর্মপদ্ধতিতে কাজ করার জন্য শিক্ষা দীক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কর্মী বাহিনী তৈরি করা হয়। এই লোকেরাই বিশ্ববাসীর সামনে ইসলামী শাসনের এমন আদর্শ নমুনা পেশ করেছিল যে, মাত্র আট বছরের সময়কালের মধ্যে মদীনার মত একটি ক্ষুদ্রায়তনের রাষ্ট্র গোটা আরব রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হয়ে যায়।“
(দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী হুকুমত কিস তারাহ কায়েম হুতি হায় (إسلامي حكومت كس طرح قايم هوتي هي ) সাইয়েদ আবুল আলা মাওদুদি, দফতরে রিসালাত, তারজুমানুল কুরআন, দারুল ইসলাম পাঠান কোট, উর্দু বই পৃষ্ঠা ৩৯; বাংলা অনুবাদ “ইসলামী বিপ্লবের পথ, আব্দুস শহীদ নাসিম, পৃষ্ঠা ৩৬)
মাওলানা মওদুদি ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদে, ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন এটা আর যাই হোক – গণতন্ত্র (Democracy) কিছুতেই নয়। কারণ যে ধরনের শাসনতন্ত্রে দেশের নাগরিকদের নিরঙ্কুশ প্রভুত্বের অধিকার স্বীকৃত হয়, রাজনৈতিক ভাষায় তাঁকেই গণতন্ত্র বলে। সেখানে জনগণের মতেই আইন বিরচিত হয়, জনগণের মতেই আইনের রদবদল হয়। তাঁরা ইচ্ছামত আইন জারী করতে পারে, আবার বিধিবদ্ধ আইনকে তাঁরাই বাতিল করতে পারে। কিন্তু ইসলামে – ইসলামী রাজনীতিতে এর বিন্দুমাত্র অবকাশ নাই । কাজেই উল্লেখিত অর্থে ইসলামী শাসন ব্যাবস্থাকে গণতন্ত্র (Democracy) বলা যেতে পারেনা ।
মাওলানা মওদুদির দৃষ্টিতে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধিকতর সঠিক ও সুস্থ নাম হতে পারে, “হুকুমাতে ইলাহিয়া” তিনি বলেন এর নামকরণের জন্য যদি আমাকে কোন নতুন পরিভাষা রচনার অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে আমি এই ধরনের শাসন ব্যাবস্থা ও পদ্ধতিকে (থিও ডেমক্রাসি) বা ‘আল্লাহর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ বলে অভিহিত করব। ( “ইসলাম কা নাজরিয়াতে সিয়াসি,” মূল উর্দু (اسلام كا نظريات سياسي ) উর্দু বই পৃষ্ঠা 24। বাংলা অনুবাদ ‘ইসলামের রাজনৈতিক মতবাদ’, অনুবাদ ঃ মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আধুনিক প্রকাশনী, ঢাকা, ১৩ তম প্রকাশ মার্চ ২০০৪, পৃষ্ঠা ২১- ২২)
মাওলানা মওদুদি গণতন্ত্রকে পাশ্চাত্য সভ্যতার ধ্বংসাত্মক নীতি হিসবে উল্লেখ করেছেন। তিনি গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, আমি তিনটি ভ্রান্ত নীতির ব্যাখ্যা করলাম, উহাই হচ্ছে বর্তমান যুগের জীবন বিধানের মূল ভিত্তি। আর এ নীতির উপরি ধর্মহীন বা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে। যাকে আমরা বর্তমান যুগে সামাজিক সগঠনের সুসভ্য মানদণ্ড হিসাবে ভেবে থাকি। এ তিনটি নীতিই ভ্রান্ত। শুধু ভ্রান্তই নয়, বরং আমরা পূর্ণ বিচক্ষণতার সাথে ইহা বিশ্বাস করি যে, এই নীতিগুলিই হচ্ছে সকল মহা বিপদের মূল কাণ্ড যার মধ্যে মানবতা আজ নিপতিত।
(দ্রষ্টব্য ইসলাম ও ধর্মহীন গণতন্ত্র, মূল উর্দু (اسلام اور لا ديني جمهوريت ) বাংলা অনুবাদ মুহাম্মাদ আবদুর রহীম, আধুনিক প্রকাশনী, ৩য় প্রকাশ ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১০-১৩ )
এখানে আরেকটি প্রশ্ন এসে যায়, সেটা হল কোয়ালিশন সরকার গঠন। অর্থাৎ যে দল বা সংগঠন ইসলামী শাসন ব্যাবস্থা চায় না, তাঁদের সাথে ঐক্য করে পদের বা ক্ষমতার ভাগীদার হবার ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে।
মাওলানা মওদুদি এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপ্লবের পক্ষপাতী, আংশিক ক্ষমতা গ্রহণের পরিপন্থী ছিলেন। এ ক্ষেত্রে মাওলানা মওদুদি এবং ওলামায়ে দেওবন্দের প্রতিনিধি শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল মধ্যে দ্বিমত দেখা যায়, পবিত্র কোরানে বর্ণিত হজরত ইউসুফ আঃ ফিরাউনের কাছে ক্ষমতা চেয়েছিলেন। সুরা ইউসুফের ৫৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ইউসুফ আঃ ফিরাউণ কে বলেছিলেন ,
قَالَ اجْعَلْنِي عَلَىٰ خَزَائِنِ الْأَرْضِ ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
وَكَذَٰلِكَ مَكَّنَّا لِيُوسُفَ فِي الْأَرْضِ يَتَبَوَّأُ مِنْهَا حَيْثُ يَشَاءُ ۚ نُصِيبُ بِرَحْمَتِنَا مَن نَّشَاءُ ۖ وَلَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ
“আমাকে নিযুক্ত করুন দেশের ধন ভাণ্ডার সমূহের দায়িত্বে। আমি প্রচুর জ্ঞানের অধিকারী এবং রক্ষক। এভাবে আমি ইউসুফকে ক্ষমতা দিয়েছিল্যাম ভূখণ্ডে। তিনি স্থান গ্রহণ করতেন সেই ভূখণ্ডে যেখানে চাইতেন।“
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসানের ব্যাখ্যা হল, “ইউসুফ আঃ ফিরাউনের কাছেই দাবী জানিয়েছিলেন যে আমাকে ধন ভাণ্ডারের দায়িত্ব দাও, আমি তাঁর যোগ্য, এবং রক্ষক কোরানের ভাষায় “ইননি হাফিজুন ‘আলিম”, (ۖ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ ) এবং ইউসুফ আঃ ফিরাউনের মন্ত্রী সভারই সদস্য হয়েছিলেন, এবং ফিরাউন সরকারেরই একজন সদস্য বা অংশীদার হয়ে গিয়েছিলেন।
মাওলানা মাহমুদুল হাসান আরও বলেন, “ধরে নিলাম ইউসুফ আঃ অর্থ সম্পদ সংক্রান্ত সার্বিক ক্ষমতা চেয়েছিলেন এবং পেয়েছিলেন ও সার্বিক ক্ষমতাই। কিন্তু তিনিতো ফিরাউনের কাছেইতো চেয়েছিলেন এবং মিসরের ফিরাউনই তো সেটা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া পরবর্তী একটি আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, হজরত ইউসুফ আলিহিস সালাম করতিক মিসরের সকল অর্থ সম্পদের দায়িত্ব গ্রহণের ও অনেক পড় পর্যন্ত মিসরে ফিরাউনের রাজত্ব বহাল ছিল এবং তাঁর ধর্মই দেশে চালু ছিল।
(দ্রষ্টব্যঃ ইসলামী রিয়াসাত, আবুল আলা মওদুদী, উর্দু
سيد أبو الاعلي مودودي، مرتبه، خورشيد احمد(اسلا مي رياست)
ইসলামিক পাবলিকেশন্স, প্রাইভেট, লিমিটেড, লাহোর পাকিস্তান। পৃষ্ঠা ১০৮-১১৩, বাংলা অনুবাদ, ‘ইসলামী রাষ্ট্র ও সংবিধান’, অনুবাদকঃ আবদুস শহীদ নাসিম, আকরাম ফারুক, আবদুল মান্নান তালিব, মুহাম্মদ মুসা, শতাব্দী প্রকাশনী, তৃতীয় মুদ্রণ, ২০১৩) পৃষ্ঠা ৫৩, ৫৪, ৫৯, ৬০, ৬১ )
( চলবে )





Comments