top of page
Search

ইসলামী বিশবিদ্যালয়ে দাওয়াহ বিভাগের প্রাথমিক দিনগুলি

ইসলামী বিশবিদ্যালয়ে দাওয়াহ বিভাগের প্রাথমিক দিনগুলি। কেমন ছিল আমাদের সেই দিনগুলি। প্রফেসর ডঃ ইকবাল আমাকে  অনুরোধ করলো এ ব্যপারে  কিছু লিখতে।

যে কোন প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রথম থেকেই জড়িত থাকা দুই দিক থেকে আবেগের। এক হল সৃষ্টি সুখের আনন্দ, অপরদিকে প্রতিকুলতার বেদনা।

হ্যাঁ, ইসলামী বিশবিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলাম এটা আমাদের কত আনন্দের তা প্রকাশের মত নয়। ইসলামী বিশবিদ্যালয়ের পর প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে আমি আরও দুটি দেশের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকত্তর শিক্ষা নিয়েছি, কিন্তু হে কুষ্টিয়া, হে বাংলাদেশ, হে ইসলামী বিশবিদ্যালয়, পৃথিবীর আর কোন বিশবিদ্যালয়কে এত বেশি নিজের মনে হয়না। জীবনে অনেক পথ মাড়িয়েছি, অনেক ক্যাম্পাস ঘুরেছি, কিন্তু আজও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছাত্র শুনলে বড় আপন মনে হয়।

ইসলামী বিশবিদ্যালয়ের প্রথম বাচ্যের ক্লাস শুরু হয়েছিল ঢাকার অদুরে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে, এখন যেখানে জাতীয় বিশবিদ্যালয়। একটা প্রশাসনিক ভবন এবং একটা ছাত্রাবাস। আর ছোট্ট কয়েক কক্ষের একটি রেজিস্টার ভবন। আল কোরআন, উলুমুত্তাওহিদ, ম্যানেজমেনট, এবং একাউনটিং  এই চারটি মাত্র বিভাগ নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা। প্রথম দিন থেকেই শিক্ষক হিসাবে পেয়েছি, তাহির আহমদ স্যার, আবুল কালাম পাটোয়ারি স্যার, একরাম স্যার আর মোশারফ  স্যার।

এ লেখাটি যদিও তাওহিদ বিভাগের অনুরোধে তাওহিদ বিভাগের সাবেক ছাত্র হিসাবে, তাওহিদ বিভাগকে উদ্যেশ্য করে, কিন্তু সে সময় তাওহীদ বিভাগকে আলাদা হিসাবে ভাগ করা অনেকটা কঠিন ছিল। চারটি বিভাগের ৩০০ ছাত্র, আমরা সবাই একই ছাত্রাবাসে একসাথে থাকতাম। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল তবুও যারা রাজনীতি করার তারা করত। আন্দোলনও ছিল, আমি সে আলোচনায় যাচ্ছিনা। তবে আপেক্ষিকভাবে হলেও দলমত নির্বিশেষে মিলমিশ ভাল ছিল।

বিশবিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে ঢাকার শহরের দুরত্ত ১৫-২০ মাইলের মত, ছাত্ররা প্রায়ই ঢাকা যেত বা ঢাকায় যাদের বাসা বা আত্মীয় স্বজন ছিল তারা ঢাকা থেকে এসে ক্লাস করত, এতে মাঝে মধ্যে ছাত্রদের সাথে বাস কন্ডাক্টর এর সাথে বচসা হত। একবার বিশবিদ্যালয় গেটের সামনে ইকবাল নামের একজন ছাত্রকে বাস কন্ডাক্টর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ইকবাল মারা যায়। এতে ছাত্ররা বিক্ষুব্ধ হয়, আন্দোলন হয়, রাস্তা অবরোধ হয়।

প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর স্যার ছিলেন প্রফেসর ডঃ মমতাজ উদ্দিন আহমদ। মমতাজ স্যার ছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্ন দ্রষ্টাদের একজন। যদিও আমিসহ তখনকার ছাত্ররা আমরা মমতাজ স্যারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি, তিনি নিজেও কিছু ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ছাত্রদের আন্দোলন, তাঁর ভুল এবং রাজনীতি মিলিয়ে স্বৈরাচার এরশাদ সে সুযোগ গ্রহন করে এবং মমতাজ স্যারকে অপসারণ করে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি মমতাজ স্যারের সেই ঘটনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য ব্যাহত করে। মমতাজ স্যার, প্রায় সকল বক্তৃতায় কোরআনের আয়াত “রাব্বানা আতিনা, ফিদ্দুনিয়া, হাসানাতান ওয়াফিল আখিরাতি, হাসানা” আয়াতটি উচ্চারন করতেন, ছাত্ররা সে সময় না বুজে ভিসি মমতাজ স্যারকে টিটকারি করত, ‘কি! সারাদিন রাব্বানা আতিনা, রাব্বানা আতিনা করে”। অথচ সে সময় আমরা কেউ বুযিনি, একজন মুসলমানের লক্ষ্যই হচ্ছে দুনিয়া এবং আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করা।

বিশবিদ্যালয় গাজীপুর থাকা কালিন সময়ে আমরা ৩ বার ২১শে ফেব্রুয়ারী বা ভাষা দিবস পালন করি, এ উপলক্ষে, দুই বারই ঘটা করে সেমিনার, বিভিন্ন প্রতিযোগিতার  আয়োজন করা হয়, এ ছাড়া একবার সিরাতুন্নবী পালন করা হয়।

প্রথম কয়েক মাস বা এক বছর, আবুল কালাম পাটোয়ারী স্যারই ছিলেন তাওহিদ বিভাগের অনেকটা একমাত্র অবলম্বন, কালাম স্যার বা পাটোয়ারী স্যার দুই নামেই তাঁকে ডাকতো ছাত্ররা। কালাম স্যার ছাত্রদের খুব প্রিয় ছিলেন। বলা বাহুল্য প্রথম কয়েক বছর কোন বিভাগেই কোন ছাত্রী ছিলনা।

তাওহীদ বিভাগের প্রথম ডীন ছিলেন আবু বকর রফিক স্যার। এবং যতদূর মনে পড়ে সে সময় আল আযহার বা ও আই সি এর অর্থায়নে মিশরের একজন সাময়িক শিক্ষক  নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।ব্যক্তিগতভাবে, রফিক স্যার মালয়েশিয়াতেও আমার শিক্ষক এবং মুরুব্বি ছিলেন।

সে সময়ের আমাদের ছাত্রদের মধ্যে অনেক আশা ছিল এই বিশবিদ্যালয়কে নিয়ে। প্রথম ব্যাচের অধিকাংশ ছাত্রই এস এস সি এবং এইচ এস সি মিলিয়ে ১৪০০ নম্বর প্রাপ্ত ছাত্র ছিল। অনেকেই অন্য বিশবিদ্যালয়ে খুব ভাল চান্স পেয়েও ইসলামী বিশবিদ্যালয়ে চলে আসে, প্রথম যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি নোটিস দেয়া হয় সেখানে ঘোষণা ছিল ছাত্রদেরকে স্কলারশিপ দিয়া হবে, কত টাকা বা কিভাবে দিয়া হবে আমার এখন ঠিক মনে নাই, তবে তাছারাও আমরা অনেকই আশা এবং মনে করেছিলাম এটা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ  ও,আই,সি থেকে দেয়া হবে, যেমনি দিয়া হচ্ছিল আই,সি,টি,ভি, টি, আর, এর ছাত্রদেরকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ও করা হয়েছিল আই,সি,টি, ভি, টি, আর, এর ক্যাম্পাস এর সাথে। আমি নিজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েও চলে এলাম। আমার জানা মতে আহসান উল্লাহ ফায়সাল (এখন প্রফেসর আহসান উল্লাহ ফায়সাল) ঢাকা বিশবিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিল এবং এক বছর পড়ে ইসলামী বিশবিদ্যালয়ে চলে আসে। আহসান বা আমার মত অনেকেই অনেক আশা নিয়ে ইসলামী বিশবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। কারন আমরা ইসলামী বিশবিদ্যালয়কে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম। যদিও সেদিন মমতাজ ভিসি স্যারকে আমরা বুজতে পারিনি এবং থাকতে দেয়নি, তবে আমার মনে হয় আমাদের সে স্বপ্ন ছিল মমতাজ স্যারেরই স্বপ্ন, দুনিয়া এবং আখেরাতের কল্যাণ। দুনিয়া এবং আখেরাত একটা কে বাদ দিয়ে আরেকটা হতে পারেনা, পৃথিবী এবং মানবতার কল্যানের মধ্য দিয়েই আখেরাতের শান্তি এবং মুক্তি, এটাই ইসলামী বিশবিদ্যালয়ের স্বপ্ন এবং দর্শন।

 

কুষ্টিয়া স্থানান্তরঃ

ইসলামী বিশবিদ্যালয় কুষ্টিয়া স্থানান্তরিত হবার পর আমাদের উপর চলে দ্বিতীয় পরীক্ষা। আমরা গাজীপুর ক্যাম্পাসেই আমাদের ব্যাচ্যলর শেষ করে ফেলি, অনার্স ক্লাস ঠিক সময়ে শেষ হলেও স্থানান্তরের কারণে আমাদের মাস্টার্স ক্লাস শুরু হয় প্রায় এক বছর পর। মূল বর্তমান ক্যাম্পাসে তখন কিছুই নাই, কুষ্টিয়া বাসী দয়া পরবস হয়ে আমাদেরকে কুষ্টিয়া শহরে একটু জায়গা দেয়। কুষ্টিয়া শহরের পি, টি, আই ভবন এবং মেডিকেল স্কুল ভবনে ঠাঁসাঠাসি করে থাকতে শুরু করি। অনেকের আবার মন টেকে না, কার ও কার মনে চিন্তা হল, কোন রকমে যদি কয়েক মাস কাটিয়ে মাস্টার্স পরীক্ষাটা শেষ করতে পারি। সত্যি বলতে কি, কুষ্টিয়া যাবার পর আমদের প্রথম কয় দিন তাওহীদ বিভাগ বলতে কি ছিল মনে করতে পারছি না। আমি আজ এ লেখা ড্রাফ্‌ট করার সময় একটু স্মৃতিচারণের চেষ্টা করলাম, অনেক কিছু মনে করতে পারলেও কুষ্টিয়া শহরে তাওহীদ বিভাগের কোন ক্লাস আমি মনে করতে পারছিনা। তবে পরিক্ষার কথা এতটুকু মনে আছে আমি খুব অসুস্থ ছিলাম, নুরুল আলম স্যারের (তিনি সম্ভবত চেয়ারম্যান ছিলেন) সহযোগিতায় বিছানায় শুয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম, এত অসুস্থ ছিলাম যে কি লিখেছিলাম বলতে পারবনা।

পরিশেষে তাওহীদ বিভাগের সাবেক ছাত্র হিসাবে দুটি কথা বলি। আমাদের প্রথম ব্যচের ছাত্ররা সবাই খুব ভাল রেজাল্ট নিয়ে ভর্তি হলেও অনেকের মধ্যেই হতাশা কাজ করত, পাশ করে কি করব, বাইরের কেউ কেউ টিটকারি করে বলত, “দাওয়াত বিভাগ, দাওয়াত খাবেন আর কি করবেন!” বলা বাহুল্য আমরা জখন  ছাত্র ছিলাম তখন মাদ্রাসা সার্টিফিকেটের মুল্য ছিল না, আমার আব্বা, মরহুম ডঃ রইসুদ্দিনের মত অনেককেই দেখেছি মাদ্রাসা পাশ করে আবার কলেজ থেকে পড়ে পরিক্ষা দিয়েছে। যারা শুধু মাদ্রাসা সারতিফিকটই ছিল তারা গ্রামে মিলাদ পরাত আর দাওয়াত খেত, দাওয়াহ বিভাগকে টিটকারি করে অনেকে সে দিকে ইঙ্গিত করত। 

আমরা যখন গাজিপুরের একমাত্র ছাত্রাবাস “প্রথম আবাসিক হল” এ ছিলাম, আমি অনেকদিন দ্বিতীয় তলার ২০৭ নম্বর রুমে ছিলাম, মইনুল হক (বর্তমানে প্রফেসর) ছিল আমার রুম মেট, আব্দুল আজিজ মল্লিক নামে আরেক রুম মেট ছিল, মল্লিক যতদূর জানি বি,সি,এস শিক্ষা দিয়ে সরকারি কলেজে জয়েন করেছে। মইনুল ছিল দ্বিতীয় ব্যাচের আমাদের এক বছর পর, আমার ঠিক সামনের রুমেই থাকত আব্দুর রহমান আনয়ারী (বর্তমানে প্রফেসর আনয়ারী)। আমাদের আর কিছু ক্লাস মেট এবং বন্ধু ছিল মাসুম বিল্লাহ এবং অলি উল্লাহ, মাসুম এবং অলি উল্লাহ পরবর্তীতে দারুল এহসান বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করেছিল বলে জানতাম। সে সময় অনেকের মা্যেই এই তাওহীদ আর দাওয়া বিভাগ নাম এবং এ বিভাগ থেকে পাশ করে কি করব সে নিয়ে হতাশা ছিল। এমনকি একবার ছাত্ররা চিন্তা করেছিল তাওহীদ আর দাওয়া নামটা পরিবর্তন করে ইসলামী স্টাডিজ করা যায় কিনা তাহলে অন্তত, ইসলামী স্টাডিজ এর শিক্ষক হওয়া যাবে। আমদের সাথে একজন জোকার ছাত্র ছিল, তাঁর নাম ভুলে গেছি সে জক করে বলত, “তাওহীদ ওয়াদ দাওয়াহ, পাশ করে বিদেশ চলে যাওয়া”। হ্যাঁ, আমাদের সাথের আব্দলু মালেক অনার্স শেষ করে মদীনা চলে গিয়েছিল আর তারেক মনওয়ার চলে গিয়েছিল লন্ডন। আমি অবশ্য এই হতাশার সময়ের অনেক পড়ে ১৯৯২ মালয়েশীয়া যাই।

তাওহীদ সম্পর্কে আরেকটি কথা না বললেই নয়, এই তাওহীদ শব্দটা কত অর্থবহ। মুসলিম জাহানের ঐক্যে রয়েছে এই তাওহিদের ভুমিকা। তাওহিদ হল মুসলিম জাহানের শক্তি। আমেরিকায় একটা কথা প্রচলিত আছে, One nation under God   অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা অধিনে আমরা সবাই এক জাতি বা উম্মাহ। দল মত, আকিদা, মাজহাব, ফিরকা নির্বিশেষে মুসলিম উম্মাহর ঐক্য এই তাওহীদের মধ্যেই লুকায়িত।

 

আবু সাইদ মাহফুজ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের ছাত্র। ব্যতিক্রম সাহিত্য সংস্কৃতি প্রথম পরিচালক, এবং সাকসেস ভর্তি গাইডের উদ্যোক্তা এবং প্রথম সম্পাদক, সাংবাদিক সমিতির প্রথম সহ সভাপতি।

 

 
 
 

Recent Posts

See All
এখানে মিষ্টি বিক্রি হয়।

ঈশপের  সেই বিখ্যাত গল্পটি দিয়েই আজকের সম্পাদকীয়টা শুরু করা যাক।  এক বয়স্ক পিতা বাজারে যাবেন এতে তাঁর কিশোর ছেলে বায়নাধরেছে সেও বাবার সাথে...

 
 
 

Comments


Contact

Never Miss a Lecture

Add your text

  • Linkedin
  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Amazon
White Structure

Never Miss a Lecture

Add your text

_London trip in Bangla.pdf

bottom of page