top of page
Search

ওয়াশিংটনে একদিন

ওয়াশিংটন। আমেরিকার রাজধানী। আমি থাকতাম হার্ডফার্ডে। ওয়াশিংটন থেকে প্রায় পাঁচ/ছয়শ’ মাইল দূরে। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রেন বা বাস ভাড়া খুবই চড়া। তাই ওয়াশিংটন যাবার সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলাচ্ছিল না। এখানে এসেছি তিন-চার মাস হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন প্রফেসর ইব্রাহীম আবু রাবী জানালেন যে, তিনি MESA (Middle East Social Association) একটি কনফারেন্সে যাবেন, আমি ইচ্ছা করলে তার সাথে যেতে পারি। আমি তো মহাখুশী এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কে! তার ওপর তারই গাড়িতে যাবো, ওয়াশিংটনে তাঁর সাথে থ্রি-স্টার হোটেলে থাকবো। এতে মহাসুযোগ।

প্রায় দুই ঘন্টা পর আমরা নিউজার্সি শহরের পেটারসন এলাকায় এসে পৌঁছলাম। এলাকায় এসে পৌঁছলাম। এখানে প্রচুর মুসলমান থাকেন। বিশেষ করে আরব এবং ফিলিস্তিনী অনেক আরবী সাইনবোর্ড দেখলাম, তাই বুঝেতে কষ্ট হবার কথা নয়, কত আরব বাস করে এখানে। অধ্যাপক ইব্রাহীম নিজেও জন্মগ্রহণকারী আমেরিকান নাগরিক।

আমরা দুপুরের খাবার গ্রহণ করার জন্য এক হোটেলে প্রবেশ করলে ইব্রাহিম একটা খাবারের নাম করেন, সেটা আমি পছন্দ করি কি-না জানতে চাইলেন। আমি এ খাবার চিনি না বললে, তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন বলো কি? এই খাবার তুমি চেন না ? তারাপর বললেন “আজ খেয়ে দেখ, আমার বিশ্বাস ভাল লাগবে। হ্যাঁ সত্যি সত্যি আমার খুব ভাল লেগেছিল, যদিও শক্ত রুটি ছিঁড়তে আমার দাঁতের বারোটা বেজেছিল। রুটির সাথে যে মালমশাল ঝাল মিষ্টি, টক দিয়েছিল, ওহ্ তার তুলনা হয় না। ”

ওয়াশিংটনে পৌঁছতে রাত প্রায় ৯টা বেজে গিয়েছিল। হোটেল রিসিপশনে এবং করিডোরে অর্ধ উলঙ্গ শ্বেতাঙ্গী তরুণীদের দেখে অধ্যাপক ইব্যাহিম দুষ্টামি করে আমাকে বললেন, দেখ মাহফুজ এদিকে সেদিক তাকাবে না কিন্তু। আমি হেসে বললাম, ‘ডোন্ট ওরি’। রাতের খাবার খেতে বেরুবো, ইব্রাহিম বললো, মিঃ মাহ্ফুজ দয়া করে কি তুমি তোমার এই দামী কোটটা আর নেকটাইটা খুলতে পার? আমি বললাম কেন ?

তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ বাবা “এটা আমেরিকা, মালয়েশিয়া নয়। বললাম, হায়রে আমেরিকা পোড়া কপাল আমার। এই আমেরিকায় আসার জন্য মানুষ এত পাগল? আমেরিকায় আসার পর থেকে আমাকে বন্ধু-বান্ধবরা অনেকবার সতর্ক করে দিয়েছে, ব্রীফকেইস সব সময় শক্ত করে ধরে রাখার জন্য। প্রফেসর ইব্রাহিম আরো বললেন, তোমার ঐ কোট আর টাই দেখে তোমার বন্ধুরা (?) ভাববে, তুমি বুঝি কোনো মিলিওনিয়ার আরো বেরুচ্ছ স্টার হোটেল থেকে ।

পরদিন সকাল ১০টার দিকে ইদ্রিসকে ফোন করলাম তার বাসায়। কিন্তু ততক্ষণে তিনি বেরিয়ে পড়েছেন। অফিসে ফোন করলাম, তিনি অফিসের কাজে বাইরে গেছেন অবশেষে তাকে পাওয়া গেল বেলা ১২টায়। বললেন, তুমি হোটেলের সামনে রাস্তার মোড়ে দাঁড়াও আমি আসছি। কিন্তু আমার ইনফরমেশন গ্যাপ ছিল কেউ কারো সাক্ষাৎ পেলাম না। ঐ হোটেলের দুটো গেট। তাছাড়া রাস্তার নাম আমি বলেছি পি, তিনি বুঝলেন টি। অবশেষে হোটেল কাউন্টারে গিয়ে জানালাম যে, মালয়েশীয়ান দুতাবাস (যেখানে ইদ্রিস কাজ করে) হোটেল থেকে মাত্র কয়েক বক্ল সামনে। প্রসংগক্রমে বলা দরকার এখানে শহরের রাস্তাগুলো খুবই সুবিন্যাস্ত। রাস্তাগুলো সোজা এবং এভিনিউ দিয়ে আড়াআড়িভাবে করা। কোন এভিনিউতে কত নং রাস্তায় যেতে হবে জানতে পারলে হিসেব করে নিতে পারবেন যে, আপনি কোন এভিনিউতে কত নং স্ট্রিটে আছেন আর আপনার গন্তব্যে পৌছার জন্য কতটুকু  আপনাকে হাটতে হবে কিংবা ট্যাক্সি নিতে হবে কিনা? সে যাক আমি কয়েক ব্লক হেঁটেই মালয়েশীয়ান হাই কমিশনে পৌছে গেলাম। সেখানে আমি মালয়ভাষা বলাতেই কেউ কেউ ধরে নিয়েছিলো আমি মালয়েশীয়ান, কারণ কোন বিদেশী সাধারণতঃ সেখানে যাবার কথা নয়। তাছাড়া আমি মালয় ভাষায় কথা বলছি। কিছুক্ষণ পর ইদ্রিস অফিসে এলেন আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলেন। ওকে বললাম আমি মাত্র আজই ওয়শিংটন থাকছি। কাল ভোরেই আবার রওয়ানা করবো, তিনি বললেন, আরে বলো কি? তুমি আমার বাসায় বেড়বেনা?

বেলা তিনটার দিকে আমরা বেরুলাম। প্রথমেই গেলাম হোয়াইট হাউজ দেখতে। ইদ্রিস বললেন তুমি অসময়ে এসেছ, সকাল ৫ টার সময় হোয়াইট হাউজের ভিতর ঢুকতে দেয়া হয়।

গোধুলি লগ্নে আমরা হোয়াইট হাউজের সামনে হাটছি। আমি ভাবনায় ডুব দিলাম। এই সেই হোয়াইট হাউজ------------। সেখানে অনেক কিছু পৃথিবীর তাবৎ শক্তি, বিশ্বের এক শ্রেণীর মানুষের দৃষ্টি কেন্দ্র, সুবিধাবাদীদের তীর্থস্থান। আবার কারো দৃষ্টিতে শয়তানখানা। যে দৃষ্টিতেই দেখা হোক না কেন, এই সাদা ঘরখানা আজকের বিশ্বের একটা কিছু। এই ঘরের সামনে আমি দাড়িয়ে আছি। তবে এই একটা কিছু কতদিন থাকবে? এক সময় তো ক্রেমালিনও ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেকেই ছিল। ছিল চেরনেনকো। আমাদের এরশাদও ছিল অনেক কিছ। ছিল রোমান সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা। ছিল মিসরের ফেরআউন (বা ফারাও) সেই আদ, সামুদ জাতি অনেকেই ছিল কোথায় গেল ওসব। মনে মনে একটা বাক্য স্মরণ হলো যে বাক্যটা আমার মাঝে মধ্যেই মনে আসে। কোন স্থান থেকে বিদায় নেয়ার সময় লিখে দিয়ে আসি, দাঁড়াও পথিক একটু শোন, তোমাকেও চলে যেতে হবে। পৃথিবীতে তোমার মত শক্তিশালীরা কেউই থাকেনি, থাকতে পারেনি। মজার ব্যাপার হলো, চলে যাবার আগে কেউ ধারণা করতে পারেনি সেও চলে যাচ্ছে।

হোয়াইট হাউজ নামটা শুনলেই মনটা চমকে ওঠে। কি আছে এই হোয়াইট হাউসে, আজ পাঠকদের কাছে তুলে ধরব হোয়াইট হাউসের ভিতর-বাহির। তেমন বড় নয় এই ‘সাদা বাড়ী’। এই হাউসে ১৮ একরের লন আর বাগান, ১৩২ টি কক্ষ, ৪১২ টি দরজা, ৩২ টি বাথরুম, ৪৫ টি ঝাড়বাতি, ৬৬টি ভাস্কর্য, ৪৯২টি পেইন্টিং আর ৪৬৮টি প্রিন্ট ও ড্রয়িংসমৃদ্ধ এই বাড়ীটির মূল কিন্তু অন্যখানে। এই বাড়ির তিন তলায় ফ্যামিলি কোয়াটার্সে আছে ১৭ টি শোবার ঘর, আর ২৯ টি ফায়ার প্লেস, এর বাইরের দেয়ালে রং করতে খরচ হয় ৫৭০ গ্যালন সাদা এ পর্যন্ত ৩০ বার রং করা হয়েছে। এটিতে প্রেসিডেন্ট, ফাস্টলেডি ও ফার্স্ট চিলড্রেনদের সেবা-যত্নে ৪৮ জন সার্বক্ষণিক কর্মী নিয়োজিত আছেন। বছরে তাদের পেছনে ব্যয় হয় ৮০ লাখ ডলার। গোটা হোয়াইট হাউসের বার্ষিক পরিচালনা ব্যয় হচ্ছে কম-বেশী ৪০ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশী প্রায় ১৯২ কোটি টাকা।

দক্ষিন প্রান্ত থেকে হোয়াইট হাউসে ঢুকলে প্রথম পড়বে এই কক্ষটা, আগে বয়লার বা ফার্নেস বসানোসহ নানা কাজে কক্ষটি ব্যবহৃত হয়েছিল। ১৯৬০ সালে কক্ষটি নতুন করে সাজানো হয়। ৩ কক্ষের বিশেষভাবে বোনা কার্পেটের বর্ডারে ৫০ টি অঙ্গরাজ্যের প্রতীক চিহৃ আঁকা আছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নবাগত কূটনীতিকরা। এই কক্ষের প্রেসিডেন্টর কাছে তাদের পরিচয়পত্র জমা দেন।

 

লাইব্রেরী কক্ষঃ

আগে কক্ষটি লন্ড্রির কাজে ব্যবহার করা হত। ১৯০২ সালে থিওডোর রুজভেল্ট কক্ষটি সংস্কার করেন এবং এর নাম রাখেন জেন্টলম্যান্স আন্টে চেম্বার। ১৯৩৫ সালে এটাকে গ্রন্থাগারে পরিবর্তিত করা হয়। বই সংগ্রহের জন্য ১৯৬১ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সংগৃহীত বইয়ের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন ভাষণ ও রচনা এ গ্রন্থাগারে রাখা হয়। এই কক্ষে প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের একটি পোট্রট রয়েছে। চা পান এবং বৈঠকের জন্য এটাকে প্রায়ই ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

কালেকশান রুম ঃ

আগের প্রেসিডেন্টসিয়াল কালেকশন রুমটি বর্তমানে চায়না রুম নামে পরিচিত। কক্ষটিকে ১৯৭০ সালে নতুন করে সাজানো হয়। এখানে একটি কাঠ গ্লাসের ঝাড়বাতি আছে, যেটি ১৮০০ সালের তৈরী। এই কক্ষে প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের ব্যবহার করা কয়েকটি সাইড চেয়ার ছাড়াও প্রায় সব প্রেসিডেন্টের আমলে ব্যবহৃত কাচ, চিনেমাটির বস্তু ও তৈজসপত্রগুলো সাজানো রয়েছে।

স্টেট ডাইনিংরুম ঃ এখানে এক সঙ্গে ১৪০ জন অতিথিকে আপ্যায়নের ব্যবস্থা আছে। আগে কক্ষটি অফিস, ড্রইংরুম ও কেবিনেট রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মেহগনি কাঠের ডাইনিং টেবিলটি ফ্রান্স থেকে ১৮১৭ সালে কেনা হয়, কক্ষের কার্পেটে রয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীর পারস্যের ডিজাইন, এখানে প্রেসিডেন্ট লিংকনের একটি পোট্রেট ম্যান্টেলের ওপর ঝুলানো রয়েছে, আর ম্যান্টেলের গায়েন অ্যাডামসের একটি চিঠির কিছু নির্বাচিত অংশ খোদাই করা আছে।

হোয়াইট হাইসের লোকদের কাজ ঃ হোয়াইট হাইস দেখতে প্রতিদিন প্রচুর পর্যটক আসে। রাষ্ট্রীয় অতিথি প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবার তো আছেই, তাদের খাতির যত্ন, আপ্যায়ন ও পথ প্রদর্শনের জন্য আছে প্রচুর লোক, তাদের কয়েকজনের কাজ- চিফ আশার (ushar) হোয়াইট হাউসের ভিতরে যাবতীয় কাজের পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকে আশার অফিসে।

 

এক্সিকিউটিভ হাউসকিপার ঃ 

হোয়াইট হাউসকে সব সময় ঝকঝকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজটি তদারকি করে থাকেন প্রধান হাউসকিপার।

বাটলার ঃ ঘুম থেকে ওঠেই তাকে আশার অফিস থেকে প্রেসিডেন্টের জন্য সেদিনের সংবাদপত্র সংগ্রহ করতে হয়। ছয় জন বাটলারকে প্রেসিডেন্টর ডাইনিং টেবিল সাজানো থেকে শুরু করে ড্রইনিং রুমের অতিথিদের যাবতীয় কাজ করতে হয়।

 

ইঞ্জিনিয়ার ঃ 

পুরো হোয়াইট হাউসের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রনের দায়িত্ব তার। রক ও অন্য প্রকৌশলীরা কম্পিউটারের মাধ্যমে জানতে পারেন প্রাসাদের কোন কক্ষের তাপমাত্রা কত।

ক্যালিগ্রাফার ঃ স্টেট ডিনার ম্যানুর বিভিন্ন খাবারের নাম থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্টর স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত সম্মানিত ব্যক্তির নাম প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম নকশা করে লেখার কাজ হচ্ছে রিক মাফলারের।

হোয়াইট হাউস পরিদর্শনের নিয়ম ঃ হোয়াইট হাউসে পাবলিক টেলিফোন বা বিশ্রামাগারের কোন ব্যবস্থা নেই। ভেতরের কোন ছবি তোলা বা ভিডিও করা নিষেধ। প্রচুর নিরাপত্তার পর ক্যামেরা নিয়ে ভেতরে ঢোকা যায়, পরিদর্শনের সময় যে জিনিসগুলো সঙ্গে রাখা নিষেধ, সেগুলো হল ঃ পোষা জন্তু, পানীয় বেলুন, চুইংগাম, ইলেক্ট্রনিক স্ট্যানগান, অগ্নি উদ্দীপক পদার্থ খাদ্য, আগ্নেয়াস্ত, গোলাবারুদ, ছুরি, সিগারেট, ম্যাচ, স্যুটকেস ইত্যাদি।

 

ইদ্রিস এরপর নিয়ে গেল পেন্টাগন দেখাতে। দাঁড়িয়ে থাকতে মন চাইলো, এই সেই পেন্টাগন। এই সেই পেন্টাগন। যা মানুষ মারার কারখানা। এ ব্যাপারে সম্ভবত কোন বির্তকের প্রয়োজন নেই, যে দৃষ্টি ভঙ্গিতেই হোক, অস্ত্র মানুষ মানান জন্যই। ইদ্রিস আমাকে অল্প সময়ে অনেকগুলো স্খান ঘুরিয়ে দেখালো, মাঝে মধ্যে একটু সমস্যা হচ্ছিল তার গাড়ী পার্কি-এ।

 


 
 
 

Recent Posts

See All
এখানে মিষ্টি বিক্রি হয়।

ঈশপের  সেই বিখ্যাত গল্পটি দিয়েই আজকের সম্পাদকীয়টা শুরু করা যাক।  এক বয়স্ক পিতা বাজারে যাবেন এতে তাঁর কিশোর ছেলে বায়নাধরেছে সেও বাবার সাথে...

 
 
 

Comments


Contact

Never Miss a Lecture

Add your text

  • Linkedin
  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Amazon
White Structure

Never Miss a Lecture

Add your text

_London trip in Bangla.pdf

bottom of page