top of page
Search

ক্ষণিকের অনুরাগ

অনেকদিন থেকে ইচ্ছা ছিল মালয়েশিয়ার গ্রাম দেখব। ডিসেম্বর ১৯৯৩। আমি তখন কুয়ালালামপুরস্থ ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনির্ভাসিটির ছাত্র। আন্তঃ সেমিষ্টার বন্ধের শুরুতে এক মালে বন্ধু জিজ্ঞেস করে বসল, ‘এই তুমি বন্ধের সময় কোথায় থাকবে? বললাম, কই আর থাকব, হলে বসে বসে আঙ্গুল চুষবো। সে বললো, তুমি ইচ্ছা করলে আমার সাথে যেতে পার। আমি তোমার থাকা এবং খাওয়ার দায়িত্ব নেব। তোমার সকল ভাড়া তোমাকে বহন করতে হবে।

এতেই আমি অসম্ভব খুশি হয়েছিলাম। একজন বিদেশী বন্ধুর পক্ষ থেকে এতটুকু সহযোগিতা অনেক। কিন্তু শেষ পর্য্যন্ত সে বন্ধের সময় আমার যাওয়া হয়নি। অনেকগুলো ব্যক্তিগত কারণেই। ঠিক হলো আগামী রমজানের ঈদ করবো তাদের গ্রামে। জুটে গেল অন্য এক বন্ধু তার নাম আদনান। কথায় কথায় তাকে বললাম, আগামী ঈদে তোমাদের গ্রামে যাচ্ছি। তারা দুজনই এ ক্লানতান এর।

আদনান কে যখন বললাম ঈদে কেলান্তান (Kelantan) যাচ্ছি। সে বললো, মনে রেখো ঈদে কেলান্তান (Kelantan) যেতে হলে কিন্তু কমপক্ষে ১ মাস আগে টিকিট কিনতে হবে। এক পর্যায়ে টিকেট কেনার দায়িত্বটা সে নিজেই নিয়ে নিলো। এরপর থেকে তার সাথে 2যখনই দেখা হতো সে নিশ্চিত হয়ে নিত আমি আসলেই যাচ্ছি কিনা। একদিন দেখা হলে বললো, “আমি কিন্তু আমার মাকে বলে দিয়েছি। তুমি আমাদের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছ।“

সত্যিই আমি খুব উৎসাহ বোধ করলাম, আদনান এর আন্তরিকতা দেখে। তাই আমিও আমার ইচ্ছা শক্তিকে প্রবল করতে লাগলাম। ঈদের ১৫/২০ দিন আগে একদিন বললো ‘তোমার কাছে ৫০ রিঙ্গিট (মালয়েশীয়ান ডলার) আছে?” বললো তোমার টিকেটের জন্য দিতে হবে, আমি সানন্দে ৫০ রিংগীট তার হাতে দিলাম।

১০ মার্চ ‘৯৪। রাত ৯টায় বাস ছাড়ার কথা। দুপুর থেকেই কাপড়-চোপড় গুছাচ্ছিলাম। বুকের মধ্যে চিন চিন করে একটা অনুভূতি এলো। আজ দেড় বছর হলো দেশের বাইরে। জীবেন এটাই ছিল আমার প্রথম প্রবাস জীবন। এই দেড় বছর পর এভাবে কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে কাপড়-চোপড় গুছাচ্ছি। এই দেড় বছরের প্রবাস জীবনে কোথাও এভাবে যাবার আগে প্রস্তুতি নিতে হয়নি। দেশে থাকতে ঈদ ছাড়াও মাঝে মধ্যে ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি যাবার আগে এটা ওটা ব্যাগবন্ধী করতাম। টুথ ব্রাস, পেষ্ট, তোয়ালে; কিছু থেকে গেল কিনা? শার্ট কয়টা নেব? কোথাও যাওয়ার সময় আমার চিরাচরিত অভ্যাস কিংবা বদঅভ্যাস হিসেবে এবারও কিছু বই ব্যাগবন্দী করলাম। যেন আহা কি পড়ুয়া! যদিও সাধারণত কখনোই সফরে আমার পড়া হয়না তবু বই’র প্রতি একটু বন্ধুত্ব দেখানোই যা। ৯ টা বাজার আগেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছলাম। তার আগে রফিক স্যারকে ফোন করে আমার যাত্রা সংবাদ নিশ্চিত করলাম। ৯ টার গাড়ি ক’টায় ছাড়বে এ প্রবাদ সেদিনও প্রতিফলিত হয়েছিল। হ্যাঁ বাস একটু দেরীতে রাত ৯.৫০ মিনিটে ছাড়ল। তার আগে বাস কর্তৃপক্ষ এসে যাত্রীদের উপস্থিতি সহ সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে গেল। প্রথমেই সম্ভাষন জানানো হল ইক্ষুরস পানীয় পরিবেশনের মাধ্যমে। তারপর একজন দাঁড়িয়ে সফরের দোয়া কালাম পড়ে মোনাজাত করল। বাসের সামনের আসনগুলো ছাত্রীদের জন্য। পেছনের সারিগুলিতেই আমরা বসলাম। বাসে একমাত্র আমিই বিদেশী। তাই আমি কেমন একটা সংকোচবোধ করছিলাম বিধায় নিজকে কেমন যেন লুকাচ্ছিলাম। কিছুক্ষন পরই বাসে অবস্থিত টিভি পর্দায় মালয় ভাষায় ফিল্ম পরিবেশিত হতে লাগল। স্বভাবতই আমি কিছুই বুঝছিলামনা। আমি ছাড়া সকলেই দেখছিলাম বারবার হাসিতে লুটোপুটি খাচ্ছিল। হলে মাঝে মধ্যেই মালয় ভাষার ছবি দেখা যেত যার অধিকাংশ ছবিতেই দেখেছি ভাঁড়ামীতে ভরা। শিল্পমান, গাম্ভীর্যতা খুবই কম।

রাত ৩ টার সময় সেহরী খাওয়ার জন্য এক স্থানে বাস থামানো হল। এটি একটি বাজার। আমি মুখ ধুয়ে এক হোটেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখি আদনান বসে আছে। সে ২ জনের জন্য খাবারের অর্ডার দিয়েছে।‘টম আইয়াম’। মানে টমেটো আইয়াম। টমেটো তো টমেটোই, আইয়াম হলো মুরগী। টম আইয়ামের নাম অনেক দিন থেকে শুনে আসছি বটে। কোনদিনও চেখে (স্বাদ গ্রহণ করে) দেখিনি। হ্যাঁ, ভালই লাগল, এবং বেশ মজাই লাগল। পানীয় হিসেবে পেলাম মাত্র ১ গ্লাস ‘তে আইস’। শব্দ শুনলেই হয়তো বুঝা যায়, আইস বা বরফ দেয়া তে বা চা। এই তে আইস বা বরফ চা মালয়েশীয়াতে বেশ প্রচলিত। এই এক গ্লাস ‘তে আইস’ পান করেই আমাকে রোজা রাখতে হলো। আমার জীবনে এই বোধহয় প্রথম যে, রাতে সেহরী খাওয়ার জন্য জেগেছি অথচ পানীয় গ্রহণ করেছি মাত্র ১ গ্লাস।

আমাদের পাশেই বসে ছিল অন্য একটি ছেলে যারা চেহারায় মালয়দের মত নয়। তাকে ক্যাম্পাসে আমি পাকিস্তানি আ আরব মনে করেছিলাম। জিজ্ঞেস করলাম ভাই, তুমি কি মালয়েশিয়ান? বলল হ্যাঁ। আমি বললাম কিন্তু তোমাকে দেখতে মালয়েশিয়ান মনে হয় না। সে বলল, তা বটে আমি মালয়েশিয়ান তবে মালে নই আরব বংশদ্ভুত। ইয়েমেনী। বেশিদিন আগের কথা নয়। তার পিতা এসে এখানে বসত গড়েছে। তাদের পারিবারিক ভাষা এখনো আরবি। তার চাচা, মামা জাতীয় আত্মীয় স্বজনেরা ইয়েমেন, জেদ্দাসহ বিভিন্ন আরব দেশে আছে।

খাবারের বিল আমরা আলাদা আলাদা পরিশোধ করলাম। আদনানকে একবার বললাম, আদনান, বিলটা আমি দেই? সে বলল, শুধু তোমারটা তোমাকে দিলেই চলবে।

সকাল ৭ টার দিকে আবার বাস থামানো হলো ফজর নামাজ পড়ার জন্য, টয়লেটের লম্বা লাইনে আমার দেরী হয়ে যায়। নামাজ শেষ করে যেতে যেতে দেখি বেশ কিছুক্ষন আগেই সবাই বাসে উঠে বসে আছে। শুধু আমিই বাকি, আদনান আমার খোঁজে বেরিয়ে আসে। ইতোমধ্যে আমি সবার মাঝে পরিচিত হয়ে পড়ি যে, বাসে একজন বিদেশীও আছে। বাসে বসার সাথে সাথে সবাই আমাকে দেখছিল। আমার লজ্জা লাগার আরেকটা কারণ ছিল, বাংলাদেশী মালয়েশিয়ান বিশেষত কেলানতানীদের কাছে বেশ পরিচিত। কারণ বাংলাদেশী ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে যতজন মালয়েশিয়ায় বিয়ে করেছে তার অধিকাংশই কেলানতানে। আর আমি যাচ্ছি সেই কেলানতানে ঈদ করতে। ব্যাপারটা কৌতুহলদ্দীপ্তই বটে। আমি কেলানতান যাচ্ছি শুনে কোনও বাংলাদেশী তো রস করে বলেও ফেলে হুঁ! গো এহেড (এগিয়ে জান)  ।

সকাল ৯ টায় আমরা কেলানতানের রাজধানী কোটাবারু তে পৌঁছি। বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে আছি। সবার চোখ আমার দিকে। মেয়েরাও। যেন আমাকে ভাল করে দেখে নিচ্ছে। আদনান বলল, চল মার্কেট ঘুরে আসি। কাঁচা বাজারে গেলাম ৯০% দোকানী মহিলা। আদনান বললো লক্ষ্য করেছ? অধিকাংশ বিক্রেতা মহিলা। বললাম হ্যাঁ, কিন্তু কেন? সে বলল কেলানতানী মেয়েরা সংগ্রামী জীবন পছন্দ করে। ঘুরতে ঘুরতে এক স্থানে দেখলাম কয়েক’শ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, হাজারও হতে পারে। অধিকাংশেরই মাথায় টুপি বা পাগড়ী। দাঁড়ানোটা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত, রাস্তার উপর। পাশেই মসজিদ। পরে শোনলাম পাশের মসজিদ থেকে কিছুক্ষণের মধ্যে কেলানতানের মূখ্যমন্ত্রী উস্তাদ নিক আজীজ জনগণের উদ্দেশ্যে হেদায়াতী বক্তব্য দিবেন। আজ জুমাবার। প্রতি জুমাবার এ মসজিদ থেকে সকাল ১০ টায় তিনি বক্তব্য দেন। আমার ইচ্ছা থাকলেও সে বক্তব্য শোনার সময় ছিল না তাছাড়া আমি বেশ আগ্রহ বোধ করলাম না এজন্য যে, বক্তব্য হবে মালয় ভাষায়।

কোটাবারু থেকে বাসে করে আমরা আদনানের বাড়ি পথে রওয়ানা হলাম। দূরত্ব ২০ মাইল। ভাড়া ১.২০ রিংগীট। যে বাস ষ্টপেজে নামলাম সেখানে থেকে তার বাড়ী আরো দেড় কিলোমিটার সে পথটা আমরা গেলাম ভাড়াটিয়া মোটর সাইকেলে। দু’জন ২ মোটর সাইকেলে উঠলাম। ভাড়া ৫০ সেন্ট করে। একটা বাড়ির ঘাটে নামতেই দেখি বাড়ির ভেতরে কিছুটা নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে। ২/৪ টি কিশোর দৌড়ে এলো। এক দুজন উঠতি বয়সের কিশোরী অন্দর মহলের দিকে প্রস্থান করল। ঘরের বারান্দার সামনে গিয়ে আমরা ব্যাগ রাখলাম। আদনান জোরে জোরে সালাম নিক্ষেপ করল ঘরের ভিতরের দিকে। ভেতর থেকে তার মা প্রতি উত্তরে সালাম দিল। মিনিট খানেক অপেক্ষার পর আদনান ঘরে প্রবেশ করল এবং আমাকে ডাকল। আমি ঢুকেই একজন বৃদ্ধা মহিলাকে দেখেই ‘আসসালামু আলাইকুম’ বললাম তিনি ওয়ালাইকুম সালাম বললেন। আদনান আমাকে একটা কক্ষ দেখিয়ে দিল, যে কক্ষে আমাকে থাকতে হবে।

কেলানতনের সাথে বাংলাদেশের আবহাওয়াগত তেমন অমিল নেই। গরম বাংলাদেশের গরমকালের মতই। তবে এ দেশে কোন শীতকাল নেই। প্রতিদিন ভোরে একটু শীত পড়ে এই যা, নভেম্বর - ডিসেম্বর মাসে বৃষ্টি ঝড়ে। কেলানতান দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের মতো। পাহাড়ের দেশ মালয়েশিয়ান এই রাজ্যে পাহাড় নেই বললেই চলে। রাজধানীর কুয়ালালামপুর থেকে ৫০০ কিঃমিঃ দূরবর্তী এই রাজ্যটি অনেক সমতল ভূমি। এই তো যেন আমার বগাদিয়া গ্রাম, সোনাইমুড়ী, পাপুয়া খামার। এইতো যেন বেগমগঞ্জ চৌরাস্তা। সবই যেন আমাদের বাংলাদেশ। কেলানতান মালয়েশীয়ার অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে গরীব হলেও আমাদের চে, অনেক বেশী ধনী। মানুষের পেটে ভাত আর পকেটে টাকা থাকলে যেমন চেহারায় চিকনাই ভেসে আসে তেমনি মালয়েশীয়ার পকেটে যে টাকা আছে তা এই অনুন্নত নিগৃহিত গ্রামের দিকে তাকালেও বুঝা যায়। মালয়েশীয় অজ পাড়া গাঁয়ে বিদ্যুৎ টেলিফোন, প্রাইভেট কার দেখলে বুঝা যায় যে দেশটির পকেটের স্বাস্থ্য কত ভাল। মালয়েশিয়ার যে কোনও গ্রামে বিদ্যুৎ আছে, পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও আছে। অজ পাড়া গায়ের ঘরে ঘরে, টেলিভিশন আছে। বন্ধুটি বলল এমন কোনও পরিবার নেই যাদের কমপক্ষে ১/২ টি মটর সাইকেল নেই। আর তাছাড়া সম্ভব তো নয়। যে দেশে কোনও রিকসা বা ঠেলাগাড়ী সিস্টেম নেই। সেখানে প্রাইভেট কার বা মোটর সাইকেল ছাড়া তো চলা সম্ভবই না।

আমার বন্ধুটির ১১ জন ভাই বোন। ২ বোন এবং ১ ভাইয়ের বাচ্চা কাচ্চা এবং মা বাবাসহ এ পরিবারে প্রায় ১ কুড়ি বনি আদম আছে। মজার ব্যাপার হলো আমার বন্ধুটি ছাড়া এই এক কুড়ি বনি আদমের কেউই ইংরেজী বা আরবী জানে না। আর আমি, তুমি জাতীয় ৫/১০ টি শব্দ টি শব্দ ছাড়াও আমারও মালে ভাষা তথৈবচ। অথচ এ পরিবারেই প্রায় সপ্তাহখানেক কাটিয়ে দিলাম।

যে দিন সকালে আমরা এ বাড়িতে পৌঁছলাম, বিকালে বাড়ির মূল কর্তা অর্থাৎ আদনানের আব্বা এলেন, আমি সালাম দিলাম। তিনি জবাব দিলেন, তারপর ভদ্রলোকে কি বলবেন বোধহয় ভেবে পাচ্ছিলেন না। তিনি একজন কৃষক, ইংরেজী কিছুই জানে না। মিনিট চার পাঁচেক পর ভদ্রলোক প্রথম বাক্য প্রয়োগ করলেন, মিনু’স আই’র কেলাপা ? মিনু’স অর্থ যে কোনও প্রকার ড্রিংকস, আই’র হলো পানি কেলাপা অর্থ কি? তাছাড়া ’ড্রিংকস, পানি------ কি হলো, রোজার দিনে ভদ্রলোক ড্রিংকস এর কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? যোগ-বিয়োগ মেলাতে পারলাম না। আমি আদনানের দিকে তাকালাম। আদনান বললো, তুমি কি ডাবের পানি খেতে পছন্দ কর? আমি খুব ঘন ঘন বেশি বেশি করে ইয়েস ইয়েস বলতে লাগলাম। ভদ্রলোকের এই জিজ্ঞাসার মধ্যে গভীর আগ্রহ ছিল, আমি তার আগ্রহটাকে মূল্যায়ণ করতে চেয়েছিলাম। তাদের শ’খানেক নারিকেল গাছ আছে। প্রতিটি নারিকেল গাছ ইয়া লম্বা লম্বা। একেকটি প্রায় ১০০ মিটার লম্বা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আদনানের আব্বা একটি বালতি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ডাব পাড়ার জন্য। ডাব পাড়ার পদ্ধতিটাও ছিল ভারি সুন্দর এবং বেশ মজার। ভদ্রলোক বাড়ির পেছনে গেলেন। ফিরে এলেন বিশাল দীর্ঘ শিকল দিয়ে বাঁধা একটি বানর নিয়ে। বানরটিকে এনে ছেড়ে দিলেন নারকেল গাছের তলায়। রশির মাথা ধরে রাখলেন নিজ হাতে। বানর নিজ থেকে উঠে গেল গাছে। আর ফেলতে লাগল কচি কচি ডাব। ভদ্রলোক নিচ থেকে মাঝে মধ্যে নির্দেশনামা জারি করছিলেন, এটা না ওটা। নারকেল নয় কচি ডাব ইত্যাদি। এক সময় নিচে নেমে আসতে বললেন, ঠিক ঠিক ভাল ছেলেটির মত নিচে নেমে এল বানরটি। বানর যে কখনো এত ভদ্র হয় তা আমার জীবনে আর দেখিনি। মালয়েশিয়ার মানুষগুলো যেমন শান্ত শিষ্ট প্রকৃতির বানরগুলোও বুঝি তেমন। আসলে মাটির সম্ভবত কোনও প্রভাব আছে।

ভদ্রলোক আরো ২/১ বার আমার সাথে কথা বলতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু আমি দুঃখিত আমি একবারও তার সাথে সমন্বয় সাধন করতে পারিনি। এ বাড়িতে ১ কুড়ি মানুষের মধ্যে ছোট্ট একটি কোশোরী ছিলো, বয়স ৬/৭ বছর হবে। আমার সবচে’ বেশি ভাব জমেছিল তার সাথে। নাম তার সোহানা। ৭/৮ বছর বয়সী এই কিশোরীরা সাধারণত একটু বেশি চটপটে, চালাক হয়ে থাকে। সোহানাও এর ব্যতিক্রম ছিলনা। এ বয়সী আমার এক দূর সম্পর্কের বোন ছিল তার নাম ছিল ‘হানা’। বেশ কিছু কারণে তার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি তথাপি পত্র বিনিময় বা অন্যান্য কারণে সে আমার খুব ভক্ত হয়ে পড়েছিল। এই সোহানার সাথে ‘হানা’ নামের অর্ধেকের বেশি মিল রয়েছে। এসব কারণে সোহানার সাথে আমার ভাবটা খুব জমেছিল। অন্য একটি মজার কারণ ছিল। সেটা হলো এ বয়োসী মেয়েরা সাধারণত দু’জন ভিন্ন লিঙ্গের মানুষের মাধ্যম বা বাহক হয়ে থাকে। সোহানাও অনেকটা সে রকম হয়ে পড়েছিল। সোহানার বড় এক বোন ছিল, কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্য ছুঁই ছুঁই করছে, আর ছিল এক অপেক্ষাকৃত তরুণী ভাবী। স্বভাবতই তাদের এবং আমার ধর্মীয় বিশ্বাস নির্ভর সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের সাথে আলাপচারিতার প্রয়োজন বা পেক্ষাপট ছিল না। কিন্তু মানুষের কৌতুহল তো থেমে থাকে না।

সোহানার সাথে আমার প্রথম বাক্য বিনিময় হয়েছিল তার বড় ভাইয়ের অনুবাদের মাধ্যমে। সোহানা আদনানের কাছে শিখে আমাকে জিজ্ঞেস করলো “হোয়াট ইজ ইউর নেইম” ? আমি যে ২/৪ টি মালে শব্দ জমা রেখেছিলাম তা ছাড়লাম, ‘নামা সায়া মাহফুজ’। আস্তে আস্তে সোহানার সাহস বাড়তে লাগলো। আমিও এটা ওটা প্রয়োজন পড়লে সোহানাকে ডাকতাম। প্রথম রাতে আদনান তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। ঘরে ২য় কোনও ব্যক্তি নেই যে আমার সাথে কথা বলবে। আমি বসে বসে টিভি দেখছিলাম। একটু দূরে অপরদিকে অবরোধ বাসীনিরাও আছে। আমার প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছে, সন্ধ্যার ইফতারির সময় ৪/৫ গ্লাস ডাবের পানি খেয়েছিলাম কিন্তু ১ গ্লাস ও (সাদা) পানি খেতে পারিনি। সাদা পানির যে কি অমৃত স্বাদ তা ভুক্তভুগী ছাড়া কেউ বুঝবেনা। আমার এ পিপাসা নিয়ে কি করবো ভাবছি। সাহস করে সোহানাকে ডাকলাম, সে আমার দিকে তাকালে হাত দিয়ে ইশারা করলাম, সে আসতে লজ্জা এবং সংকোচ করছিল, তার মা, ভাবী এবং বড়বোন ঠেলে পাঠিয়ে দিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আইর আডা’? অর্থাৎ পানি আছে? সোহানা দৌড়ে ভেতরে গেল। তার ভাবী বা বড়বোন কেউ একজন উঠে গেলেন, মিনিট দু’য়েকের মধ্যে চলে এলো ঠান্ডা পানি। খুশি হলাম এই কারণে প্রথমত একটা মাত্র মালয় বাক্য ব্যবহার করলাম শুদ্ধ হয়ে গেল, কেউ হাসল না, তার মানে ভুল হয়নি। ২য়ত ভাল লাগছিল আমি তাদের সাথে ঘনিষ্ঠ হচ্ছি।

পরদিন সকালে সেহরী খেয়ে ফজর পড়ে ঘুমালাম, জাগলাম সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। আমি গোসল করতে যাচ্ছি পথেই দেখা হলো সোহানার সঙ্গে, সাথে তার সেই বোনটি। বোনটি তাকে কি যেন শিখিয়ে দিচ্ছে! সেই শেখানো বুলি হিসাবে সে বললো “ গুড মর্নিং”, আমি কি উত্তর দেব ভাবছিলাম। কারণ, যখনই তারা কোনও ইংরেজী বাক্য ব্যবহার করে আমি চেষ্টা করি মালয় বলতে। তাছাড়া আমি ইংরেজী বললে হয়তো তারা বুঝবেনা। এ জন্য চুপ করে থাকতে হয়। আমার শব্দ ভান্ডারে যে কটি শব্দ ছিল তার মধ্যে সবচে বেশি ব্যবহৃত শব্দ ছিল ‘তা ফাহাম’ অর্থাৎ বুঝি না। তাদের প্রায় কোনও কথাই বুঝতে পারি না। মধ্যে মাথা নাড়াই যেন কিছু একটা বুঝেছি এমন অভিনয় করি। কিন্তু যখন দেখি গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেছি, আর অভিনয় চলছে না। তখন বলি তা ফাহাম। তাতে অন্তত প্রশ্নকর্তা নিঃসঙ্গ বোধ করেন। কোনও প্রশ্নকর্তা যদি কোনও প্রকার উত্তর না পান তখন অপমান বোধ করেন, ভাবেন তাকে অনাহুত ভাবা হচ্ছে, এজ্য কোনও প্রশ্নের উত্তর না দেয়া চরম অভদ্রতা। আল্লাহ পাক আল কোরআনের সুরা আদ দোহায় প্রশ্ন কারীকে নিরাশ না করার জন্য বলেছেন।

এ বাড়িতে এসে আরো ৩/৪ জনের সাথে আমার ভাব জমেছিল। যাদের মধ্যে একজন তাদের পাড়ার পাঞ্জেগানা মসজিদের ইমাম। যার সাথে আমার গভীর ভালবাসা জমেছিল কিন্তু তার একটি শব্দও আমি বুঝিনি। তার সাথে আমার ভাব বা বাক্য বিনিময়ের সবচে পরিচিত যে শব্দ ছিল তা হলো ‘আসসালামু আলাইকুম’, ওলাইকুম সালাম’ প্রথম প্রথম তিনি কথা বলতেন, পরে যখন বুঝলেন আমি কিছুই বুঝি না তথন আর তেমন কথা বলতেন না। কিন্তু মানুষ শব্দ ব্যবহার ছাড়াও যে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে তার বড় প্রমাণ পেলাম। ভদ্রলোক আমাকে দেখলেই এক গাল নিঃশব্দ হাসি হাসতেন। যে হাসি ছিল পৃথিবীর সবচে’ নির্মল এবং নিস্কলুষ। প্রাণভরা হাসি। মনে হতো তিনি সারা শরীর থেকে হাসতেন। কিন্তু কোনও শব্দ বেরুচ্ছেনা। এখানে এসে যে বিষয়টা সবচে বেশি

উপলব্ধিতে লেগেছে সেটা হলো মানুষের প্রতি মানুষের যে মমতা কিংবা মানবতা সেটা অনেক বড়। কোনও ভাষা ছাড়া কথা ছাড়া ভাব বিনিময় মানুষ তা ব্যক্ত করতে সক্ষম। একই আচরণ হয়েছিল আদনানের আম্মার সাথে, ভদ্র মহিলা কোনও কথাই বলতেন না। হয়ত ভাবতেন লাভ হবে না। যা বলতে চাইতেন ইশারায় বলতেন। অবশ্য মাঝে মধ্যে অস্ফুট হয়ে ২/৪ শব্দ বেরিয়ে যেত।

এই সারা গ্রামে আর যে ২ ব্যক্তির সাথে আমার কথা হয়েছিল তাদের একজন ওসমান। তিনি মিশরের আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ বছরের ডিগ্রী নিয়ে এসেছেন। তিনি আরবি জানেন তার সাথে আমার আরবিতে কথা হতো। তবে তিনি আই, ইউ ইংরেজী জাতীয় ২/৪ শব্দ ছাড়া কিছুই জানেন না।

এক বিকেলে আদনান নিয়ে চললো গভীর গ্রামে, তার বড় ভাইয়ের মোটর সাইকেলে চড়ে। আমরা আদনানের বাড়ী থেকে আরো ৭/৮ মাইল ভেতরে গ্রামে গেলাম। যেখানে সড়ক পথগুলো পাকা করা। ৬/৭ ফুট চওড়া এসব পাকা সড়ক পথে মোটর সাইকেলই একমাত্র যানবাহন। ধানক্ষেত সুপারি বাগানের মাঝ দিয়ে এই সরু পাকা পথ চলে গেছে বাড়ির পাশ দিয়ে।

মালয়েশীয়ার সর্বত্র যা দেখেছি সেটা হলো এখানে কোথাও মেয়েরা পিছিয়ে নেই। মেয়েরা মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ছে। আমাদের দেশে কে ভাববে যে রাত ৯/১০ টার দিকে একজন যুবতি নারী তারাবীর নামাজ পড়ে একা একা গ্রামের আবছা অন্ধকারে পথে বাড়ির দিকে নিঃসংঙ্কচে হেটে যাবে। এখানে এটা খুবই মামুলী ব্যাপার। কোনও মালে ছেলে মেয়ের সামনে একথা বললে সে বুঝতেই পারবেনা এখানে ব্যতিক্রম কি আছে। আসলে আমার মনে হয় আমাদের দেশে আমরা মেয়েদেরকে তাদের যথাযোগ্য অধিকার দেইনি বলেই তসলিমা নাসরিনের মত লেখিকারা অহেতুক ইসলামকে দোষারোপ করে। ইসলাম কখনোই মেয়েদেরকে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখতে বলেনি। ফলাফল দাড়িয়েছে বাংলাদেশের মত ৮৫% মুসলিম অধ্যুষিত কঠোর অবরোধ প্রথার দেশে অনেক অপকর্ম ঘটছে। অথচ মালয়েশীয়ার মত ৫০% মুসলি অধ্যুষিত নারী স্বাধীনতার দেশে অধিকাংশ মুসলিম নারী শালীনভাবে অবলীলায় রাস্তায় চলাফেরা করে।

আমরা যখন গ্রামে বেড়াতে বেরুলাম। দেখলাম গেঁয়ো পথে বৃদ্ধরা মাথায় পাগড়ী পরে মোটর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। প্রচুর পাগড়ী টুপি পরা মোটর সাইকেল আরোহী দেখলাম। অপর দিকে বোরখা বা লম্বা জুব্বা পরিহিতা মোটর সাইকেল আরোহিনীও দেখলাম। রাজধানী কুয়ালালামপুরেও এ দৃশ্য মামুলী যে, একজন নারী পায়ের নখ থেকে মাথার তালু, হাতের নখ সর্বাঙ্গ ঢাকা অবস্থায় ভোঁ ভোঁ করে মোটর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে।

কেলানতানে মেয়েদের সাইকেল এবং মোটর সাইকেল চালনা দেখে একবার খুব ইচ্ছা হলো একটা ছবি নেয়ার কিন্তু সাহস হচ্ছিল না। আমার সাথে ক্যামেরা ছিল। একবার বন্ধু আদনানের পেছনে মোটর সাইকেলে চড়ে ঘুরছি। বেশ দূরে দেখলাম এক যুবতী সাইকেল চালিয়ে আসছে। মোটর সাইকেলের পেছনে বসেই তাক করে ছিলাম। কাছে আসতেই ক্লিক করে ছবি নিয়ে নিলাম, ফ্লাশ লাইটের আলোতে মহিলা বুঝে গেলেন কি ঘটেছে! হু করে একটি মৃদু শব্দ করে উঠলেন। ততক্ষণে আমরা অনেকদূরে চলে এসেছি মহিলাও অনেক পেছনে চলে গেলেন। মনে মনে অপরাদবোধ জেগে উঠলো কাজটা কি ঠিক করলাম? মনকে প্রবোধ দিলাম আমি তো কোনও ব্যক্তিগত অসৎ প্রবৃত্তি নিয়ে ছবি নিতে যাইনি। তবুও বিবেক দংশন করছিল কাজটা বোধহয় ঠিক হয়নি।

এক সকালে ঘুম থেকে উঠতেই আদনান খবর দিল আজ এক স্থানে জানাযা পড়তে যাব। বললাম ও.কে। আমি প্যান্ট শার্ট পরে তৈরী হলে আদনান বললো একি তুমি প্যান্ট পরে গ্রামে যাচ্চ জানাযা পড়তে। বলা বাহুল্য লুঙ্গি হলো মালয়েশীয়ার জাতীয় পোষাক। হাটছি রাস্তায় সেই ইমাম সাহেবের সাথে দেখা, যিনি আমাকে দেখেই একগাল হাসেন, তারপর দাঁড়াতে বললেন, আদনানকে জিজ্ঞেস করলাম ভদ্রলোক কি বললেন, তিনি দাঁড়াতে বললেন তার ছেলে মোটর কার নিয়ে আসছে, মোটর কারে করে আমাদেরকে নিয়ে যাবেন। এক সময় সরু পাকা রাস্তা থেকে গাড়ী মেঠো পথে নেমে গেল। মৃত বাড়ীতে পৌঁছে দেখলাম এই মেঠো বাড়িতে শুধু এ মোটর গাড়িটি নয় আরও ২০/২৫ টি মোটর গাড়ি এবং ৩০/৩৫ টি মোটর সাইকেল জমা হয়ে আছে। সবাই গাড়ি করে এসেছে জানাযা পড়ার জন্য। জানাযা পড়লাম একটি বিশাল ঘরে। ঘর থেকে বেরুনোর সময় কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকের হাতে হাতে একটি করে প্যাকেট ধরিয়ে দিলেন। বাইরে এনে খুলে দেখি তার ভেতরে ৫ ডলারের একটি নোট। আদনানের প্যাকেটেও ৫ ডলার। আদনান বললো এটাই তাদের ট্র্যাডিশন। জানাযা পড়তে গেলে প্রত্যেককে টাকা দেয়া হয়। তবে আশ্চর্য হয়ে যে বিষয়টা লক্ষ্য করলাম সেটা পুরো বাড়িতে কাউকে কাঁদতে দেখিনে। আমি একথাটা আশ্চর্য হয়ে বারবার আদনানকে বললে সে বললো, আমরা মালয়েশীয়ানরা আরব বা তোমাদের উপমহাদেশীয়দের মত আমাদের ভেতরের অনুভূতি প্রকাশ করে বেড়াইনা। আসলেই তাই। মালয়েশীয়ানরা কখোনো প্রতিবাদ করে না। প্রকাশ করে না। কোনও কারণে যদি আপনার উপর মণক্ষুন্ন হয় কিছুই বলবে না, মনে মনে ফুলবে।

আমাদের নিঃশব্দ ভালবাসার সবচে ট্রাজেডিক বহিঃ প্রকাশ ঘটেছিল যে সময় আমি সে বাড়ি থেকে বিদায় নিলাম। বিদায়ের ঠিক ২০/২৫ মিনিট আগে আমি আদনান, সোহানা এবং তাদের ৫/৬ বছর বয়সী সর্বকনিষ্ঠ ভাই আমিন সহ ছবি তুললাম। আদনানকে বললাম তার বড় ভাইকে অনুরোধ করার জন্য আমাদের ছবি তুলে দিতে। ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি এর আগে জীবনে কোনওদিন ছবি তুলেননি। আমি তাকে দেখিয়ে দিতে এগিয়ে গেলাম, আদনান বলল না না ও পারবেনা। সে তার তরুণী বোনটিকে ডাকল। যার সাথে আমার কোনওদিন সরাসরি কথা হয়নি। যদিও আমার সামনেই ঘুরাফেরা করেছে। বয়স ১৫/১৬ হবে। মোটামুটি সুন্দরী। সে এগিয়ে এসে নিঃসংকোচে আমার কাছে ক্যামেরা চাইল। আমি ক্যামেরা এগিয়ে দিলাম। সে সুন্দরভাবে ছবি তুলে নিল। মেয়েটি অভিজ্ঞ ক্যামেরাম্যানের মত ছবি তুলে নিল, যা তার বড় ভাই পারলো না। মেয়েরা সাধারণতঃ এসব ব্যাপারে একটু চালুই হয়ে থাকে তাছাড়া সে সম্ভবত লেখাপড়া করে। আদনান আমাকে আগে বলেছিল তার এক বোন একটু একটু ইংরেজী বলতে বুঝতে পারে। এই সেই বোন কিনা আমি কখনো জিজ্ঞেস করিনি। হয়তোবা, কারণ সেই মাঝে মধ্যে সোহানাকে ২/৪ টি ইংরেজী বাক্য শিখিয়ে দিচ্ছিল।

বিদায় মুহুর্তে আমি আদনানকে অনুরোধ করলাম তার মাকে ডাকার জন্য। আদনানকে বললাম, সবাইকে বল যে, আমি তোমাদের অত্যন্ত মধুর আতিথেয়তা এবং অমায়িক ব্যবহারে অসম্ভব রকম খুশি হয়েছি। আমার চিরদিন স্মরণ থাকবে। আমি আমার আব্বা আম্মাকে তোমাদের কথা লিখব। আদনান আমার আবেগভরা ৩/৪ টি বাক্যকে এক বাক্যে সংক্ষিপ্ত করে কিছু বললো, আদনানের এই সংক্ষিপ্ত বাক্য আমার কেন যেন পছন্দ হলো না। আমার মনের আকুতি যেন প্রকাশিত হয়নি। আমি শব্দ প্রয়োগে পরিবর্তন এনে বাক্যের বৈচিত্র দিয়ে কথাগুলি আবার বললাম। আদনান এবার সম্ভবত আমার অনুভূতি বুঝতে পেরেছে। এবার সে কিছুটা আবেগভরা কন্ঠে বেশ কয়েকটি বাক্য প্রয়োগে মিনিটখানেক কি কি বলল, প্রতি উত্তরে তার মা বাবা সেই একগাল হাসলেন এবং কি যেন বললেন। আদনান তরজমা করল যে, তারাও তোমার আগমন এবং আচরণে খুব খুশি হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে। আদনানের আম্মা মাথার ওড়না হাতে জড়িয়ে নিয়ে আমার দিকে হাত এগিয়ে দিলেন হাত মেলানোর জন্য। আমিও নিঃসংকোচে হাত এগিয়ে দিলাম। প্রসংগক্রমে বলা দরকার এদেশে কিন্তু নারী পুরুষ হাত মেলানো খুব বড় দোষণীয় নয়। বিশেষত বয়স্কা মুরব্বী মহিলাদের সাথে হাত মেলানো স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে একেবারে শহুরে অত্যাধুনিক পরিবার ছাড়া গ্রাম্য বা ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে যুবক যুবতীরা হাত মেলায় না। আমি আদনানের আব্বা, বড় ভাই এবং ছোট ভাইদের সাথে হাত মেলালাম। তাকিয়ে দেখলাম সবার ছল ছল চোখ। কেউ কিছু বলছে না। এক ভাষাহীন অনুভূতি। ঘর থেকে বেরুলাম। আদনানের আম্মা এবং ভাই বোনেরা দরজা পর্যন্ত এগিয়ে এল। তাকিয়ে থাকল। মোটর সাইকেলে উঠতে যাব সে সময় সোহানা এগিয়ে এল, কি একটা বাক্য বলতে গিয়ে ভুলে গেল। আবার দৌড়ে গেল তার বড় বোনটির কাছে, তারপর এগিয়ে এসে বলল “ব্রাদার মাহফুজ কাম এগেইন।“

আমি মোটর সাইকেলের পেছনে বসে এ বাক্যটি অনেকবার মনে মনে আওড়ালাম। “ব্রাদার মাহফুজ কাম এগেইন।“ মানুষের জীবনে তো লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি বাক্যই বলে এবং মানুষ শোনে। বিশেষত আমার মত যাদের বকবক করা অভ্যাস তাদের জীবনটাই তো কথামালা। কিন্তু আমার জীবনে এত সুন্দর বাক্য শুনেছি কিনা এখন মনে হচ্ছে না। “ব্রাদার মাহফুজ কাম এগেইন।“ তাছাড়া বাক্যটি কিন্তু শুধুমাত্র সোহানার মুখ থেকে নিঃসৃত নয়। আমার মত বয়সীর জন্য বিরাট অনুভুতি। পৃথিবীতে অনেকরকম মানুষ থাকে। কেউবা খুবই ভাবগম্ভীর কেউ বা একেবারে খোলামেলা, হৃদয়ঘটিত ব্যাপারে কেউ খুবই উদার কেউবা কঠোর। কিন্তু আমাকে কোনও মানুষ ভালবাসে আমার উপস্থিতি কারো কাছে আনন্দময় এমন অনুভুতি যে কোনও প্রকৃতির মানুষের জন্য ভারি আনন্দের। মোটর সাইকেলের পেছনে যতক্ষণ বসেছিলাম আমার মধ্যে এক উষ্ণ অনুভুতির অব্যাহত ছিল।

হ্যাঁ আমাকে আবার যেতে হয়েছিল সোহানাদের বাড়িতে। আল্লাহ পাক কোন মানুষের মনের একান্ত ইচ্ছা অপূর্ণ রাখেন না। “ব্রাদার মাহফুজ কাম এগেইন।“ এ বাক্যটি হয়তো বা একান্ত হৃদয় নিঃসৃত ছিল। তাই সেই রাতেই ২/৩ ঘন্টার ব্যবধানে আমাকে ফেরত যেতে হয়েছিল। না, ট্রেন ফেল করিনি। ব্যাপারটা এমন, কথা ছিল আদনানের বাড়ি থেকে ৮/১০ কিলোমিটার দূরবর্তী দক্ষিন চীন সাগরের পাড়ের এক বন্ধুর বাড়িতে ১ দিন ২ রাত থেকে সূর্যোদয় দেখব তারপর ১৬ মার্চ কুয়ালালামপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করব। সব ঠিকঠাক। রওয়ানা দিলাম সাগর পাড়ের বন্ধুটির বাড়ি, কিন্তু গিয়ে দেখি সে বন্ধুটির বাড়ি মেহমান ভর্তি, ঈদ উপলক্ষে তার বোনেরা সকলে বেড়াতে এসেছে বাপের বাড়ি।

রাত সাড়ে ১০ টার দিকে আমরা আবার আদনানের বাড়ি ফিরে এলাম। যখন মৃদু মৃদু বৃষ্টি ঝরছিল। ঈষৎ শীত শীত আবহাওয়ায় সকলে বিছানায় চলে যাচ্ছিল সোহানা তখন গভীর ঘুমে অচেতন। সে দেখেনি ব্রাদার মাহফুজ তার কথা রেখে ফিরে এসেছে। আমরা বেশ ক্লান্ত ছিলাম বলে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোর রাতে ৫ টার সময় উঠে আবার চলে গেলাম সাগর পাড়ে সূর্যোদয় দেখার জন্য, তাই সে রাতে সোহানা বা আমার অন্য কোনও ছোট্ট বন্ধুর সাথে দেখা হয়নি। তাদের সাক্ষাৎ পেয়েছিলাম সকাল ১০ টায় যখন সাগর পাড় থেকে ফিরে এলাম। সোহানা খুশি হয়েছে। সকাল ১০টায় যখন তার সাথে দেখা হলো তখন সে তার আনন্দ প্রকাশ করল তার সেই তরুণী বোনটির শেখানো মুখস্থ বাক্যটি দিয়ে “ব্রাদার মাহফুজ গুড মর্নিং” সেদিন প্রায় সারাদিন বৃষ্টি ছিল, তাই আমরা কোথাও বাইরে বেড়াতে যাইনি। আমি সারাদিন আমার জন্য বরাদ্দকৃত রুমে বসে বসে বা শুয়ে শুয়ে কাটিয়েছি। সোহানা তার কনিষ্ঠ ভাই আমিন এবং নাম না জানা তার এক বোন সারাদিন আমাকে সঙ্গ দিয়েছিল। সোহানা এবং তার শিশু সঙ্গীরা কিছুক্ষণ পর পরই সেই মুখস্থ বাক্যটি প্রয়োগ করছিল “ব্রাদার মাহফুজ গুড মর্নিং” বেলা ২ টা, বিকেল ৪ টা, ৫টা সন্ধ্যা ৭টা সারাক্ষণ সেই একই “গুড মর্নিং” বাক্যটি প্রয়োগ করছিল। তার বোনটি হয়তো শুনতে পায়নি, শুনলে নিশ্চয়ই “গুড মর্নিং” কে “গুড আফটারনুন” করে দিত। আমি একবারও তাদেরকে শুধরিয়ে দিতে চেষ্টা করিনি, চিন্তাও করিনি। কেন? কি দরকার? সুন্দরই তো শোনাচ্ছে। আমি তো বুঝতে পারছি তার হৃদয় কি বলতে চাইছে। ভাষা দিয়ে কি হবে? শুদ্ধ-অশুদ্ধ কি আসে যায়? হৃদয়ের অনুভূতিই তো কত। মাঝে মধ্যে মনে হতো সোহানা তুমি আমার পাশে বস তারপর একটানা এক নিঃশ্বাসে সারাক্ষণ বলতে থাক “ব্রাদার মাহফুজ গুড মর্নিং” আমি রেকর্ড করে নিই। আর ক্যাম্পাসে হলে মাঝে মধ্যেই শুনতে পেতাম “ব্রাদার মাহফুজ গুড মর্নিং।

’হঠাৎ মনে পড়ল, আজ ১৫ মার্চ। হ্যাঁ, তাইতো আগামীকাল ১৬ মার্চ আমি চলে যাচ্ছি এ বাড়ি ছেড়ে। পৃথিবীটা বড় কঠিন। পৃথিবীতে কেউ যেতে চায়না আবার কেউ যেতে দিতেও চায় না। কিন্তু তারপরও সকলেরই চলেই যেতে হয়। কোনই উপায় নেই যেতে সকলকে হবেই। পৃথিবীতে মানুষ রঙ্গরসে মেতে উঠে, পসরা বসায়, ভাবে হয়ত চিরদিন থাকবে। তখনই আজরাইল আসে। সময় দেয় না এক সেকেন্ডের জন্যও। দুদিনের এই মুসাফিরখানায় কেউ স্থায়ী নয়, অথচ মানুষ রেখে যায় কত আবেগ, অনুভুতি, কত ভালবাসা কত স্মৃতি। ভাবতে ভাবতে আমার চোখের কোণে পানি এনে গেল, হৃদয়ের মণিকোঠায় অন্যরকম ব্যাথা অনুভব করলাম। আমার বুকটা যেন হঠাৎ ফাঁকা ফাঁকা মনে হচ্ছিল। বসা অবস্থা থেকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম বালিশটা টেনে এনে বুকের নিচে রাখলাম। হায়, আজই এখানে আমার শেষদিন। জীবনে হয়তো আর কোনদিন আসব না এখানে। কোথায় বাংলাদেশ, কোথায় কুয়ালালামপুর কোথায় কেলানতান। আর কোনদিনও কি এখানে আসা আদৌ সম্ভব? এক বছর পরই পাশ করে যাচ্ছি। দেশে চলে গেলে তারপর ঢাকা-কুয়ালালামপুর বিমান ভাড়া ২০/২২ হাজার টাকা। ভিসা? থাকা কোনদিনও সম্ভব নয়। মনকে প্রশ্ন করলাম, কেন আসলাম?

সত্যি আমার জন্য কষ্টের ব্যাপার ছিল কোনও ভাষা ছাড়া, কোনও বাক্য ছাড়া এই ৫/৬ দিন একদল সহজ সরল নিষ্পাপ গ্রাম্য মানুষের সাথে যখন আমার শব্দহীন ভাষাহীন এক গভীর ভালবাসা গড়ে উঠেছিল। ঠিক সে সময় সব ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়ে এই এক সপ্তাহের আদর ভালবাসাকে পায়ে দলিয়ে দিয়ে আমি পালিয়ে এসেছিলাম। আমার টিকেট করা ছিল ২০ মার্চের। কিন্তু আমি ১৬ মার্চ ডঃ রশিদ মতিন স্যারের সাথে তার প্রাইভেট কারে করে এসেছিলাম। সামনে পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে ২০ তারিখের আগেই চলে আসতে মনস্থ করলাম। ডঃ রশিদ মতিন স্যার বললেন তিনি ভোর ৬ টায় কোটা বারু থেকে রওয়ানা করবেন।

সূর্যোদয়েরও এক দেড় ঘন্টা আগে। কোটা বারু থেকে আদনানের বাড়ি ৩০/৪০ কিলোমিটার সুতরাং ভোর রাত ৫ টায় রওয়ানা দিলাম। তার মানে সূর্য উঠার আড়াই ঘন্টা আগে। কাউকে জাগালাম না। একে তো সময় নেই ভোর রাত, তাছাড়া আবার গত দিন একবার বিদায় নিয়েও যেতে পারিনি। আজ যেতে পারব কিনা এজন্য কিছুটা লজ্জা পেয়েছিলাম আজ এই অন্ধকার রাতে কাউকে বললাম না, যদি আবার ফিরে যেতে হয়। সম্ভবনাও ছিল।

ডঃ রশিদ মতিন স্যার যে বাড়ি থেকে রওয়ানা করবেন সে বাড়ি আদনান ভালভাবে চিনে না, কোনদিনও যায়নি। আদনানের আব্বা আম্মা জেগেছিলেন, তাদের কাছ থেকেই বিদায় নিলাম। কিন্তু কাউকে বলে না আসলেও আমাকে চলে আসতে হয়েছিল। আমার বারবার মনে হচ্ছে সকালে সোহানা যখনই সেই রুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলতে চাইবে “ব্রাদার মাহফুজ গুড মর্নিং” আর দেখবে মাহফুজ নামের কোনও প্রাণী সে ঘরে নেই বরং এলোমেলো বিছানা, বালিশ, চাদর তাকে তিরস্কার করে বলবে,

হিজল বনে পালিয়ে গেছে পাখি,

যতই তারে করুণ সুরে ডাকি,

দেয়না সাড়া নিরস গহীন বন,

বাতাসে তার ব্যাথার গুঞ্জনরণ।

সে সময় হয়ত সোহানা স্তম্ভিত হয়ে যাবে। ভাবে ব্রাদার মাহফুজ তুমি রাতের আধারে পালিয়ে গেলে? কেন এসেছিলে? কেন দিয়ে গেলে ক্ষণিকের ভালবাসা?


 
 
 

Recent Posts

See All
এখানে মিষ্টি বিক্রি হয়।

ঈশপের  সেই বিখ্যাত গল্পটি দিয়েই আজকের সম্পাদকীয়টা শুরু করা যাক।  এক বয়স্ক পিতা বাজারে যাবেন এতে তাঁর কিশোর ছেলে বায়নাধরেছে সেও বাবার সাথে...

 
 
 

Comments


Contact

Never Miss a Lecture

Add your text

  • Linkedin
  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Amazon
White Structure

Never Miss a Lecture

Add your text

_London trip in Bangla.pdf

bottom of page