top of page
Search

চীন সাগর থেকে আটলান্টিক

১৯ সেপ্টেম্বর’ ১৯৯৫ সালের মঙ্গলবার সারাদিন প্রচন্ড ব্যস্ত। একটুখানি ভুল হলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। থিসিসের ফাইনাল কপি আজকে জমা দিতে হবে, ব্যাংক ড্রাফট করতে হবে। না হলে মার্কিন ইমিগ্রেশন এন্ট্রি করতে দিবে না। আজ মিস করলে এ সেমিষ্টার ধরা যাবে না। সারা দিনের প্রচন্ড ব্যস্ততার পার বিকেল ৫ টায় ওয়াই পি এম হোষ্টেলে এসে গা এলিয়ে দিলাম, ভাবনা এসে জড়ো হলো, সত্যি সত্যি আমি মালয়েশিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমার প্রিয় মালয়েশিয়া যেখানে আছে কেলান্তান যেখানে আছে আমার প্রিয় ক্যাম্পাস এবং আছে ফেলা আসা বন্ধুরা ভাবতে ভাবতে চোখের কোণে পানি চলে এলো।

 

রাত সোয়া ৯টায় কুয়ালালামপুর সুবাং বিমানবন্দরে জাহিদ, ফজলু, লুৎফুর ভাইদেরকে বিদায় দিয়ে ইমিগ্রেশন পেরুলাম। সবুজ বাংলাদেশী পাসপোর্ট দেখে ভালোভাবে চেক করলো। রাত ৯.৫৫ মিনিটে শুরু হলো প্রথম যাত্রা। বিদায় মালয়েশিয়া।


 

রাত ১১.৫৫ মিনিটে সিংগাপুর থেকে বিমান ছাড়ার কথা ছিল, ছাড়লো ২০ মিনিট পর রাত ১২.১৫ মিনিটে অর্থাৎ ২০ সেপ্টেম্বর। আকাশে উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যে একটা প্রচন্ড শব্দ শুনলাম। ডান পাশের জানালা দিয়ে বিমানের ডানা দিয়ে আগুনের ফুলকি বেরুতে দেখলাম। যাত্রীরা কিছুটা আতংকিত হয়ে পড়লো, বিমানবালা বার কয়েক যাত্রীকে নিরস্ত করতে চেষ্টা করলো, আমি প্রথমে একটু চমকে উঠলেও পরক্ষণে ভাবলাম এটাই সম্ভবতঃ স্বাভাবিক। একটু পরেই পাইলটের ঘোষণা হলো, দুঃখ প্রকাশ করা হলো যে বিমানে যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছে, তাই আমরা এক্ষুণি আবার সিঙ্গাপুর ফিরে যাচ্ছি। আশ্বস্ত করা হলো যে, সব কিছু নিয়ন্ত্রনের মধ্যে রয়েছে। সাথে সাথে বলা হলো বিমানবন্দরে নামার সাথে সাথেই আপনাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা রয়েছে। যারা দেরীর কারণে আত্মীয় স্বজনকে ফোন করে জানাতে চান তাদেরকে ফোন কার্ড দেওয়া হবে। সাথে সাথে দেরী না করে কোন ফ্লাইটে কত নং গেট থেকে আমরা যেতে পারবো জানানো হলো। তাদের এই চমৎকার ব্যবস্থাপনায় আমি মুগ্ধ হলাম। সমুসা, কেক, অরেঞ্জ, জুস, কফি সবই খেলাম, ১০ ডলারের একটা ফোন কার্ড পেলাম যা দিয়ে নিউ ইয়র্কে মামাত ভাই মান্নানকে ফোন করলাম, ইউনিভার্সিটিতে ফোন করলাম। বন্ধুদের সাথে কথা বলেও ১০ ডলারের কার্ড ফুরালোনা। মালয়েশিয়া, সিংগাপুরে তখন রাত আড়াইটা বাংলাদেশে সাড়ে ১২ টা. তাই এত গভীর রাতে কাউকে বিরক্ত করা সমীচিন মনে করলাম না।

রাত ৩ টা ২৫ মিনিটে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। আমার সীট পড়েছিল জানালার পাশেই। বিমানবালাকে ডেকে বললাম, আমি একজন সাংবাদিক, তুমি কি দয়া করে আমাকে ইনফর্ম করবে, যখন আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থান অতিক্রম করবো? বিমানবালা বললেন, আমরা কোথায় আছি, এখানকার সময়, গন্তব্য এসব পর্দায় সব দেখানো হবে। সত্যিই চমৎকারভাবে ম্যাপের মাধ্যমে দেখানো হলো কোথায় আছি আমরা, বিমানের গতি কত, আবহাওয়া কেমন, ঘড়িতে সময় কত. যেখান থেকে এসেছি এবং যেখানে যাব কোথাকার স্থানীয় সময় কত। কখন গিয়ে পৌছবো।

 

আমি হালাল খাবার চাইলাম। জানতে চাইলো আমি আগে তাদেরকে অবহিত করেছিলাম কিনা। আমি বললাম, না, সেটা করতে ভুলে গেছি। বালা বললো, যেহেতু আমি আগে ইনফর্ম করিনি, সেহেতু আমাকে স্পেশাল কিছু দেওয়া যাবেনা তবে তাদের কাছে মুসলিম ফুড এর প্যাকেট আছে, যাতে ছিল ভাত, চিংড়ীমাছ, ডিম এবং সবজী। পরদিনও আমাকে তাই দেওয়া হলো, আমার কাছে ভাল লাগলো না তাই টুনা মাছ চাইলাম। মহিলা (বিমানবালা) আমার মাথার কাছে সীটে একটা স্টিকার লাগিয়ে দিল এবং বললো যে, সে আগাম কল করে দিয়েছে; সেখান থেকে আমার জন্য মাছের ব্যবস্থা করা হবে। আমার আশেপাশে যাত্রীদের এ সময় হরদমছে লাল পানি টানতে দেখলাম, আমাকে তাই ঘন ঘন অরেঞ্জ জুস পরিবেশন করা হলো। সত্যি সিংগাপুর এয়ারলাইন্সের এই জামাই আদর আমার বেশ ভাল লাগলো। শুধু খাবার-দাবার কেন ২ বার টুথব্রাশ-টুথপেষ্টও দেয়া হলো, বারবার সতেজকারক তোয়ালে দেয়া হলো।

এর মধ্যে আমার ঘড়িতে যখন সকাল ১০ টা তখন সূর্যের লালিমা দেখে বিমানে বসে বসেই ফজর নামাজ সারলাম। ভোর রাতে সাড়ে ৩ টার মাথায় প্রথম সূর্যের লালিমা দেখছিলাম মনে হল,  তারপর উজ্জ্বল আল এবং সূর্যোদয় দেখা স্বাভাবিক ধারণা থাকলেও সেই সূর্যোদয় দেখলাম ৮ ঘন্টা পর, এর কারণ আমাদের বিমান যাচ্ছিল পশ্চিম দিকে, সূর্যের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছিল আমাদের বিমান, সূর্য আমাদের পিছু নিয়েছে।


আমস্টার্ডাম থেকে নতুন বিমানবালা ও নতুন যাত্রীসহ আমার কাছে সবই নতুন। আমিও দেড় ঘন্টার যাত্রা বিরতি পেয়ে বিমান বন্দরে ঘুরে ফিরে নতুন হয়ে এলাম। হল্যান্ড বা নেদারল্যান্ড বিমানবন্দর অবস্থিত আমস্টার্ডম-এ। ইউরোপীয় দেশ। ঘুরে ফিরে দেখলাম, ২ টা ভিউকার্ড কিনে মালয়েশিয়া এবং ঢাকাতে পাঠালাম। হল্যান্ড থেকে চিঠি পেয়ে নিশ্চয়ই চমকে উঠবে। প্রতিটি কার্ড কেনা এবং পাঠাতে আড়াই ডলার খরচ হয়েছে। যদিও হল্যান্ডের মুদ্রামান ইউ, এস ডলার থেকে কম ০১:১.৫

আমষ্টারডম যখন পৌছলাম তখন আমার ঘড়িতে বিকেল ৫ টা অথচ আমষ্টারডমে বেলা ১১ টা। বিমান যখন মধ্যাকাশে ছিল তখন প্রচন্ড রোদ, তাপদাহ, বিমান যখন নামতে শুরু করে তখন দেখি আমষ্টারডমের আকাশে নেমে আসি। ওহ ঠান্ডা, কুয়াশা,  কোথায় গেল এতক্ষণকার তাপদাহ। আমি খুব টায়ার্ড অনুভব করছি। গত রাতে অনেকেই বসে বসে বা কাৎ চিৎ হয়ে ঘুমাতে পারলেও আমার ঘুম আসেনি। এক পলকে চেয়ে থাকি জানালার বাইরে কৌতহলী কিশোরের মত। কখনো নীচে দেখা যায় রঙ্গিন আলোর শহর। কখনো বা বসে চিঠি লিখি আম্মাকে, বন্ধুদেরকে । সূর্যোদয়ের পর থেকে উপভোগ করি প্রকৃতির আসল সৌন্দর্য। না, পৃথিবীর কোন ভাষা সে সৌন্দর্যের বর্ণনা দিতে পারবেনা। বলবেন, অপূর্ব? পৃথিবীতে অনেক সৌন্দর্য দেখেই তো অপূর্ব বলেছেন।

আমরা ভেসে যাচ্ছি। নীচে সাদা মেঘের সমুদ্র পাহাড়। সেই সাদা মেঘের সমুদ্রে পড়েছে টকটকে লাল সূর্যের রক্তিম আলোক। উপরে গাঢ় নিখাদ নীল আকাশ। দূরে দেখেছি সাগর, ভিডিও পর্দা বলছে সেটা কৃষ্ণসাগর, মাঝে মধ্যে দেখেছি অন্য একটি বিমান উড়ে যাচ্ছে দূর সুদূরে কোথাও। আকাশে সূর্যের লালিমা এখনো মিলিয়ে যায়নি। এবার একটু ভাবুন, এমন সৌন্দর্য দেখেছে কেউ এই জনমে? কিছুক্ষণ পর আবার দেখলাম বালির পাহাড়। হাজার হাজার মাইল শুধু বালির পাহাড় রং বেরং চিত্র বিচিত্র, অপূর্ব। ভিডিও ম্যাপ বলছে আমরা এইমাত্র পারস্য সাগর পেরুলাম। অর্থাৎ মধ্যপাচ্যের আরব মরুভুমি পাড়ি দিচ্ছি। ২/৩ ঘন্টা পর্যন্ত বিমান পাড়ী দিচ্ছিলো এসব মরুভুমি। মাঝে-মধ্যে দেখলাম মরুভুমির মাঝখানে চলে গেলো সরু সড়ক পথ শত শত হাজার হাজার মাইল। কখনো চোখে পড়লো একটি ছোট্ট শহর কিছু দালান কোঠা।

আমষ্টারডম ছাড়লাম, বেলা ২টা ৩টার দিকে। আমষ্টারডম থেকে আমার জন্য মজার মজার মাছ আনা হলো। এবার শুরু হল আটলান্টিক পাড়ি দেয়া। তারপর একসময় মেঘ। মেঘে ঢাকা আটলান্টিক। আটলান্টিকের আকাশ সাদা মেঘে ঢাকা। মেঘের ফাকে এক সময় বৃটেন। ভিডিও ম্যাপ দেখিয়ে দিচ্ছে, আমরা বৃটেনের দক্ষিন প্রান্ত ছুয়ে এগিয়ে যাচ্ছি আটলান্টিক হয়ে নিউইর্য়ক। আমরা এখন সম্পূর্ন আটলান্টিক এর উপর, নীচে শুধু সাদা মেঘ। মেঘের নিচে পানি। শুধু পানি আর পানি। আটলান্টিকের তর্জন গর্জন কিছুই চোখে পড়ছে না।

নিউইর্য়ক জন এফ কেনেডি এয়ারপোর্টে অবতরণের পূর্বে বিমান প্রায় ২ ঘণ্টা  যাবৎ আটলান্টিকের তীর ঘেষে চললো, বোস্টন, কানেকটিকাট, নিউ ইংল্যান্ড হয়ে, নিউ ইয়র্ক, এই সেই নিউইর্য়ক। আটলান্টিক। আমরা উড়ছি আটলান্টিক আর নিউইর্য়কের মাঝে। যুক্তরাষ্ট্রে (নিউইর্য়ক) তখন বেলা ২ টা, মালয়েশিয়ায় রাত ২ টা। বাংলাদেশ রাত ১২ টা। ঘুমাচ্ছে আমার মা, আব্বা। ঘুমাচ্ছে মালয়েশিয়ার বন্ধুরা ক্যাম্পাস।


 
 
 

Recent Posts

See All
এখানে মিষ্টি বিক্রি হয়।

ঈশপের  সেই বিখ্যাত গল্পটি দিয়েই আজকের সম্পাদকীয়টা শুরু করা যাক।  এক বয়স্ক পিতা বাজারে যাবেন এতে তাঁর কিশোর ছেলে বায়নাধরেছে সেও বাবার সাথে...

 
 
 

Comments


Contact

Never Miss a Lecture

Add your text

  • Linkedin
  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Amazon
White Structure

Never Miss a Lecture

Add your text

_London trip in Bangla.pdf

bottom of page