top of page
Search

বিল গেটস এর নিমন্ত্রণে একদিন

লেখাটার শিরোনাম দেখেই অনেকেরই হয়তো চক্ষু ছানাবড়া হবে। ইসসসসস! বলে কি?! বিল গেটসের নিমন্ত্রন! হুঁমমমমম, কথাটা শুনেই যে কোন মানুষই পুলকিত হবে, ঈর্ষান্বিত হবে কিংবা অবিশ্বাস করবে। বিল গেটস আবার কাউকে নিমন্ত্রন করে খাওয়ায় নাকি। গপ্পের আর যায়গা পেলে না।

হ্যাঁ, সেই বেশী দিন আগের কথা না। এই ২০০৮ সালের গোড়ার দিকের কথা। সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে বলতে হয়ে ফ্রেব্রয়ারী শেষ দিকে। আমি তখন ফোর্ড মোটর কোম্পানীতে সফটওয়্যার কোয়ালিটি স্পেশালিষ্ট হিসেবে একটা প্রজেক্টে কাজ করছিলাম। আমার বায়োডাটা ইন্টারনেটে দেয়া ছিল। একদিন হঠাৎ একটি ফোন পেলাম অফিসে বসেই। ফোনকারী কন্ঠ অত্যন্ত নরম ভদ্র্। সফটওয়্যার কোয়ালিটি সর্ম্পকে ছোটখাট দু একটি জরুরী প্রশ্ন করেই আলোচনা বেশী দুরে না নিয়ে আমাকে সরাসরি প্রস্তাব করলেন যে, সিয়াটলে মাইক্রোসফটের হেড কোয়াটার্সে  “সফট কোয়ালিটি এস্যুরেন্সের” একটি পরীক্ষামূলক প্রোগ্রামে আমাকে যদি বাছাই করা হয় তাহলে আমি যাব কিনা।

 

আরে বাবা, কথার আগা মাথা কিছুই নাই। কে বা কারা আমি কিছুই জানিনা, প্রস্তাবটির বাস্তবতা কতটুকু না বুঝার কারণে কি উত্তর দেব ভাবতে পারছিলাম না। তাই প্রস্তাবকের পরিচয় এবং বাস্তবতা সর্ম্পকে আমি দু একটি প্রশ্ন করলাম। তাতে আমাকে বলা হলো যে, আমি যদি ইচ্ছুক হই, তাহলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একজন উপরস্থ কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে একটি ছোটখাট ইন্টারভিউ নিবেন, যদি সে ইন্টাভিউ বাছাইতে আমি নির্বাচিত হই তাহলে পরবর্তি পরিকল্পনা জানানো হবে। আমি রাজী হলাম, ঠিক আছে, দেখিনা কি হয়। 

সপ্তাহ খানেকের মধ্যে একটি ফোন কল পেলাম। যদিও সত্যি বলতে কি, আমি তেমন একটা গুরুত্বই দিলাম না, এজন্য যে, আই.টি জগতে এমন ফোন কল অহরহই পাওয়া যায়। যে সব ফোন কলের বেশীর ভাগই আসে ইন্ডিয়া থেকে। অনেকে তো কথা বার্তা এমনভাবে বলেন যে, আহামরি কিছু। তাই আমি তেমন গুরুত্বই দিলাম না। কিন্তু না, ইন্টারভিউ ফোন কলের ঠিক দুদিন পরে আবারো একটি কল পেলাম যে, আমাকে মাইক্রোসফটের নিমন্ত্রনে নির্বাচিত করা হয়েছে। প্রোগ্রাাম হবে সিয়াটল থেকে ২০-২২ মাইল দুরে সামামিশ নামে ছোট্র একটি  শহরে আমাকে থাকতে হবে রেডমন্ড এ মাইক্রোসফটের হেডকোয়াটার্স এর সাথেই এক হোটেলে।  মাইক্রোসফটে আমার প্রোগ্রাম মাত্র একদিন, ১৪ই মার্চ শুক্রবার। আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো আমি কতদিন থাকতে চাই সিয়াটলে। ১৩ই মার্চ বৃহষ্পতিবার সকালের দিকে সেখানে পেীছাবো এবং শনিবার রাতে ফিরবো বলে জানালাম। সে অনুযায়ী আমার জন্য দু’ রাতের হোটেল, এবং ৩ দিনের জন্য গাড়ী বুকিং দেয়া হলো। কিছুটা স্বপ্নের মতই এক সপ্তাহের মধ্যে সত্যি সত্যিই সবকিছ ঘটে গেল। সবকিছুই হলো ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে। আমেরিকান এয়ারলাইন্সে আমার টিকেটের বুকিং এবং কনফারমেশন, সিয়াটলে আমার জন্য গাড়ী রিজার্ভেশন সবকিছুই হলো ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে। ব্যাপারটা যেহেতু অনেকটা অসম্ভব অসম্ভব মনে হচ্ছিল তাই আমি কাউকে তেমন কিছুই জানালাম না। আমার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু গোলাম সরোয়ার থাকেন সিয়াটলে তিনি টি-মোবাইলে চাকুরী করেন, আমার সফরসূচী সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবার পর সরোয়ার ভাইকে ফোন করলাম। এবং সংক্ষেপে বললাম যে, আমি সিয়াটলে আসছি। কেন আসছি কিভাবে আসছি কিছুই জানালাম না, শুধু বললাম আমি এক সেমিনারে আসছি।


১৩ই মার্চ বৃহষ্পতিবার কিছুটা চুপে চুপে একা একা নিজের গাড়ী ড্রাইভ করে এয়ারপোর্ট চলে গেলাম এবং লং টার্ম পার্কিং এ রেখে টার্মিনালে চলে গেলাম। নাহ, কোন সমস্যাই হলো না, সবরকম চেকিং শেষে ঠিকমতই বিমানে উঠে বসলাম। বিমানে উঠেই আমি কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। ইতিপূর্বে বিমানে চড়ার ঘটনা প্রায় শ খানেক হয়ে যেতে পারে। বিশ্বেন ৯ টি দেশের প্রায় ৭৫টি শহরে ঘুরেছি, প্লেনে, বাসে, ট্রেনে। তারপরও আবেগপ্রবণ হবার একটা কারন ছিল আমার কাছে সবকিছুই স্বপ্নের মতই মনে হচ্ছিল, আমাকে একটি কানা কড়িও খরচ করতে হচ্ছে না, অথচ আমার বিমান ভাড়া, হোটেল, সিয়াটলে ৩দিন ভাড়া করা গাড়ি সব রিজার্ভ করা হয়ে গেছে। তাছাড়া সিয়াটলে সেীন্দর্যের কথা সারা জীবন শুনে এসেছি, আজ সে সেীন্দর্য্য স্বচক্ষে উপভোগ করতে যাচ্ছি।

 

সিয়াটলের পথে

                ডেট্রয়েট থেকে সিয়াটল বিমানে ৫ ঘন্টার সফর। আমার সিট জানালা পাশেই পড়লো বা বলা যায় জানালার পাশেই নিলাম। বিমানে উঠলে চিরাচরিতভাবে আমি অল্প বয়সী তরুনদের মতই হয়ে পড়ি। জানালা দিয়ে প্রকৃতির অপরুপ সেীন্দর্য্য প্রাণভরে উপভোগ করি। ভাগ্যিস আকাশও পরিষ্কার ছিল। আমাদের বিমান যখন ইলিনয় রাজ্য পার হয়ে উইসকনসিন, মন্টানা, ডাকোটা রাজ্যগুলো পার হচ্ছিল আর এই রাজ্যগুলোর অপরুপ পাহাড় পর্বত, নদী নালা সত্যিই স্বপ্নপুরীর মতই লাগছিল।

একদিকে সাদা মেঘের ভেলা তুলার পাহাড়ের মত ভেসে যাচ্ছে, তার নীচে দেখা যাচ্ছে মনোরম পাহাড়, পর্বত, নদী, নালা, খাল বিল, বাড়ী ঘর, শহর নগর। কখনো বা আবার শুধু খালি মাঠ আর মাঠ।  আমি প্রাণভরে চোখ দিয়ে দেখছিলাম আর ছবি তুলছিলাম।

 

অবতরণ 

সিয়াটল সময় বেলা আনুমানিক এগারটায় সিয়াটলে নামলাম। সিয়াটল এয়ারপোর্টে নেমে একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করলাম। সিয়াটল এয়াপোর্টে ইংরেজীর পাশাপাশি জাপানি ভাষায়ও ঘোষনা দেয়া হয়ে থাকে। ব্যাপারটা বুঝতে বেশী দেরী হলো না যে, সিয়াটলের পাশেই প্রশান্ত মহাসাগর, আর প্রশান্ত মহাসাগরের ঠিক অপর পাড়েই রয়েছে জাপান। সম্ভবত জাপান সহ ঐ পথের বেশীর ভাগ যাত্রী সিয়াটল হয়েই যাতায়াত করেন। এটাই হলো এরিয়া ভিত্তিক এয়ারপোট গুলোর বিশেষ দিক।

 

আমি এয়ারপোর্টের কাউন্টার থেকে বেরিয়ে খোঁজ করতে গেলাম রেন্টাল কার এর কাউন্টারে। রেন্টাল কারের কাউন্টারে গিয়ে দেখলাম সে এক এলাহী কান্ড। এতক্ষণ যে মনে মনে পুলকিত হচ্ছিলাম মাইক্রোসফট আমাকে এতই জামাই আদর করছিল এই ভেবে আর মাইক্রোসফটের এই আদরকে আমি বিল গেটসের নিমন্ত্রন হিসেবে তরজমা করে পুলকিত হচ্ছিলাম। কিন্তু সিয়াটলের রেন্টাল কার কাউন্টারে গিয়ে দেখলাম বিল গেট শুধু আমাকেই জামাই আদর করছে না। প্রতিদিন প্রতিনিয়তই সারা বিশ্ব থেকে মেহমানরা মাইক্রোসফটের মেহমানখানায় এসে থাকেন। রেন্টাল কারের গাড়ী ভাড়ার অধিকাংশ যাত্রীই মাইক্রোসফটের যাত্রী এবং এগুলোর বেশীর ভাগই মাইক্রোসফটের দাওয়াতে আসেন এবং বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই মাইক্রোসফটই ভাড়া পরিশোধ করেন। হোটেলের অবস্থাও তথইবচ। আর হোটেলটাও মাইক্রোসফটের হেডকোয়াটারের ঠিক পাশেই, পাশের বিল্ডিং বললেও ভুল হবে না।

এয়ারপোর্টে গাড়ী পিক করতে গিয়ে সকল ফর্মালিটি শেষে আমাকে বলা হলো নীচতলায় গিয়ে জনৈক আবদুল এর কাছ থেকে গাড়ি পিক আপ করতে। আবদুল ছিল সোমালিয়ান মুসলিম। জিজ্ঞাসা করলাম সিয়াটলে কোন ইন্ডিয়ান বা আরবীয় রেস্টুরেন্ট আছে কিনা। আবদুল আমাকে পুরো ম্যাপ এনে দিল। একটি পাকিস্তানী রেস্টুরেন্টে যাবার ম্যাপটাও তাদের কাছে রয়েছে। আগেই যেমন বলা হয়েছে যে, প্রতিদিনই সারা বিশ্ব থেকে মাইক্রোসফটে মেহমানরা আসেন, এবং পাকিস্তানী ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টের খোঁজটাও নৈমিত্তিক ব্যাপার। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে রেস্টুরেন্ট পর্য্যন্ত যেতে আমার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগলো। আনুমানিক বেলা দেড়টার সময় আমি রেস্টুরেন্টে গিয়ে ঢুকলাম। ওয়াও! ঢুকেই দেখি আরেক মজার কান্ড। রেস্টুরেন্টে বসে আছেন আমার বন্ধু সরোয়ার ভাই সহ এক দঙ্গল বাঙালী, আরে এ যেন ভুত দেখে চমকে উঠার মত। সরোয়ার ভাইয়ের সাথে দেখা ১২ বছর পর। যদিও সরোয়ার ভাই জানেন আমি সিয়াটলে আসছি আর আমিও জানি সরোয়ার ভাই সিয়াটলে থাকেন তাই তেমন আঁতকে উঠার কথা নয়, তবুও এই ভাবে রেস্টুরেন্টেই দেখা হয়ে যাবে তা আমরা ভাবিনি। সরোয়ার ভাইরা অফিস থেকে দুপুরে লাঞ্চ করতে এসেছেন তাই আবার অফিসে চলে গেলেন, আর আমি লাঞ্চ সেরে হোটেলে চলে গেলাম। বিকেলে সরোয়ার ভাই হোটেলে এলেন এবং আমাকে নিয়ে গেলেন বাসায়, সরোয়ার ভাই পীড়াপিড়ি করতে চাইলেন আমি যেন তাঁর বাসায়ই থাকি, কিন্তু আমি বললাম হোটেলে থাকাই আমার জন্য ভাল কারণ পরদিন সাত সকালেই আমার প্রোগ্রাম শুরু। ভাবী মজার মজার খাবার তৈরি করলেন, আমরা গল্প গুজব করলাম, খেলাম এবং রাতে অন্য এক বন্ধু আমাকে হোটেলে নামিয়ে দিয়ে গেলেন।  যে হোটেলে আমি ছিলাম তার আশে পাশেই সবগুলোই মাইক্রোসফটের বিল্ডিং। এ যেন মাইক্রোসফটেরই শহর।

সকাল ৭টায় আমার প্রোগ্রাম। আমাকে আগেই সকল ডাইরেকশন দেয়া ছিল, ম্যাপ দেয়া ছিল। তাছাড়া হোটেলে ফ্রি ইন্টারন্যাট ছিল, যে কোন কাগজপত্র প্রিন্ট করার ব্যাবস্থা ছিল। সুতরাং সকাল ৬টার মধ্যেই নাস্তা সেরে সাড়ে ৬টায় বেরিয়ে পড়লাম। উফ, সকাল বেলার সেই ড্রাইভিংটা ছিল বড়ই মজার এবং আনন্দের। সিয়াটল শহরটাই আসলে দেখার মত, উপভোগ করার মত একটি শহর। পাহাড় ঘেরা, ঘন কুয়াশা ঘেরা, বৃষ্টি ভেজা সিয়াটল। নয় গরম, নয় ঠান্ডা, নাতিশীতোঞ্চ এই শহর। পাহাড় পর্বতের কারণে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। বছরের কখনো কখনো তো পাহাড়ী বৃষ্টি লেগেই থাকে।

আমাদের প্রোগ্রাম ছিলো সিয়াটল থেকে প্রায় ১৫ মাইল দুরে বিশাল, মনোরম একটি ছোট্র পাহাড়ের পাদদেশে অপরুপ সুন্দর একটি লেকের ধারে। আমি যখন ড্রাইভ করছিলাম, বার বার দুপাশের অপরুপ সেীন্দর্য্য এমনভাবে উপভোগ করছিলাম যে গাড়ীর সামনে চোখ রাখা কঠিন হয়ে পড়ছিল। ইয়া বিশাল পাহাড়, তার গায়ে মেঘের পরশ, আবছা কুয়াশা, কোথাও ঝরনার ঝরঝর পানি আহা এ যেন কাব্য নগরী।

যে ভবনে আমাদের প্রোগ্রাম সেও যেন ছিল প্রযুক্তি জগতের আরেক স্বপ্ন শহর। সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা নাগাদ এক নাগাড়ে আমার প্রোগ্রাম চললো, মাঝে প্রতি ৬০ মিনিট পরই ছিল ১০ মিনিটের একটি বিরতি। পাশেই ছিল চা কফি, নাস্তা, ফ্রি ভ্যান্ডিং মেশিনে নানান রকমের ক্যান্ডি। সকাল ৭টা থেকে বেলা ২টা নাগাদ ৭ ঘন্টা ছিলাম মাইক্রোসফট, শখ হয়েছিল বিল গেটসকে দেখার। মাঝে মধ্যেই মনে হলো, এই বুঝি বিল গেটস এসে ঢুকবে, সবাইকে গ্রিটিংস দিবে। নাহ, যার বাড়ীতে দাওয়াত তারই দেখা নেই।


মাইক্রোসফট এবং বিল গেটস

বিল গেটস এর দাওয়াতেই যেহেতু এলাম,  বিশ্বের সেরা ধনী এ ব্যাকটিকে নিয়ে দু কলম লেখা দোরকা।  ১৯৫৫ সালের ২৮শে অক্টোবর রাত ৯টার একটু পরে এই ক্ষণজন্মা পরুষ জন্মগ্রহন করেন। বিল গেটের জন্মই হয়েছে চাঁদ কোপালী। তিনি এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহন করেন যে পরিবারের ছিল সফল ব্যাবসা, রাজনীতি এবং সমাজসেবার  ইতিহাস। বিল গেটসের পরদাদা, বা দাদার বাবা ছিলেন একজন স্টেইট রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং মেয়র, তাঁর দাদা ছিলেন ন্যাশনাল ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর বাবা ছিলেন একজন নামজাদা আইনজীবি। (See, Wallace, 1992, P.8-9)  সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে বিল গেটসের জন্মই হয়েছে মেধা উচ্চাকাংখ্যা এবং প্রতিযোগীতামূলক মনমানষিকতা নিয়ে। শিশুকাল থেকেই বিল গেটস ছিলেন অসাধারণ মেধার অধিকারী।

 

কম্পিউটারের প্রথম ব্যাবহার

১৯৬৮ সালের হেমন্ত কালে (স্প্রিং) বিল গেটস যে স্কুলে পড়তেন সেই প্রাইমারী (ইলেমেন্টারী) স্কুলে ছাত্র ছাত্রীদেরকে কম্পিউটারের সাথে পরিচয় করার সিদ্ধান্ত হয়। সেসময় কম্পিউটার ছিল খুব বেশী দামী, এত দামী যে কম্পিউটার কেনার পয়সা দিয়ে স্কুল পরবর্তী বছর চলতে পারে। স্কুল কর্তৃপক্ষ এলাকা থেকে ফান্ড রেইজ করে কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে।

সেই যায় কোথায়, স্কুলের কিছু তরুন বিল গেটস, পল এ্যলেন সহ আরো কিছু তরুন কম্পিউটারের প্রেমে এমন বিভোর হয় যে, তাদেরকে কম্পিউটার থেকে পৃথক করাই কঠিন হয়ে পড়ে। তারা দিন রাত কম্পিউটার ল্যাবেই পড়ে থাকতো, প্রোগ্রাম লিখতো, কম্পিউটার নিয়ে খেলতো, কম্পিউটার সম্পর্কিত বই পুস্তক পড়তো। এবং এই কম্পিউটার প্রেমাসক্তি এত চরম আকার ধারণ করলো তারা যেন সত্যি সত্যি আবেগঘন কোন প্রেমেই পড়ে গিয়ে ছিল। তারা ঠিকমত খাওয়া করতো না, ঘুমাতো না, ক্লাসে দেরীতে আসতো, সারা রাত কম্পিউটার ল্যাবে থাকার কারণে ক্লাসে এসে ঘুমাতো, হোম ওয়ার্ক জমা দিত না, ক্লাস বাদ দিয়ে কম্পিউটার ল্যাবে বসে থাকতো।  (See, Wallace, 1992, P.24)

১৯৬৮ সালে কম্পিউটার সেন্টার কর্পোরেশন নামের একটি কোম্পানী সিয়াটল শহরে একটি কম্পিউটারের ব্যাবসা চালু করে। সেই কোম্পানীতে কর্মরত একজন প্রোগ্রামারের এক ছেলে পড়তো বিল গেটসের স্কুলে সেই সুবাদে সেই কোম্পানী স্কুলের ছাত্রদেরকে কম্পিউটার ব্যাবহারের সুযোগ দেয়। এতে এই তরুনরা কম্পিউটার নিয়ে খেলতে খেলতে কম্পিউটারের রগ রেশা জেনে নেয় এবং আস্তে আস্তে সমস্যাও সৃষ্টি করতে থাকে। তারা কম্পিউটারের মূল প্রোগ্রাম নিয়ে খেলতে খেলতে এক পর্যায়ে কয়েকবার কম্পিউটার সিস্টেম ক্র্যাশ করে (অচল করে দেয়), কম্পিউটারের সিকিউরিটি সিস্টেম ভেঙে ফেলে। আরো মজার ব্যাপার হলো এই কোম্পানী ছাত্রদের কে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কম্পিউটার ব্যাবহারের অনুমতি দেয়। কিন্তু এই ডানপিটে তরুনগুলো কম্পিউটার সিকিউরিটি সিস্টেমে গিয়ে তাদের সময় কয়েক সপ্তাহের জন্য বাড়িয়ে নেয়।

                বিল গেটস, পল এ্যলেন এবং আরো দুজন ছাত্র যারা কম্পিউটার সিস্টেম ভেঙে দেয়া কর্মটি করে তারা কম্পিউটারের মাধ্যমে তাদের মেধা এবং যোগ্যতাকে বাস্তব জগতে নিয়ে আসার পরিকল্পনা গ্রহন করে। এদিকে লেক সাইড স্কুলের এই দামাল তরুনা যখন স্কুলের সিকিউরিটি সিস্টেমে ঢুকে পড়ে তখন স্কুল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে এবং এটা যে তাদের সিস্টেমের দুর্বলতা এটা তারা মেনে নেয় এবং তারা এই তরুনদেরকেই নিয়োগ দেয় এই সিস্টেমে দুর্বলতা এবং রোগ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করতে।  বিনিময়ে কোম্পানী তরুনদেরকে অসীম কাল ল্যাব কম্পিউটার ব্যাবহারের অনুমতি দেয়। আহা কি মজা বালকরা তো তাই চেয়েছিল তারা কোম্পানীর এই নিয়োগ লুফে নেয়।

 

কম্পিউটার ব্যাবসা

১৯৬৯ সালে কম্পিউটার সেন্টার কোম্পানী অর্থ সংকটে পড়ে, এবং সত্যি সত্যি দেউলিয়া হয়ে পড়ে এবং ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে কোম্পানী বন্ধ হয়ে যায়। বিল গেটস এবং তার বন্ধুদের কম্পিউটার ব্যাবহারের আর কোন জায়গা থাকলো না। বিল গেটস এবং এ্যলেন ভাবতে লাগলো কোথায় পাওয়া যায় কম্পিউটার! ভাগ্যিস, বিল গেটসের বন্ধু এ্যলেনর বাবা চাকুরী করতেন ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটনে সেখানে তারা কম্পিউটার ব্যাবহারের অনুমতি পায়। এবং শুধু তাই নয় তারা সত্যি সত্যি চাকুরীর মত কাজ পায় তারা। ইনফরমেশ সাইন্স ইনক একটা পে রোল প্রোগ্রাম তৈরি করার জন্য তাদেরকে নিয়োগ দেয় বিনিময়ে কোম্পানী তাদেরকে বিনা মুল্যে কম্পিউটার ব্যাবহারের অনুমতি দেয় তাছাড়া প্রোগ্রাম তৈরি করতে পারলে পোগ্রামের উপর রয়ালটি দিতে রাজী হয়্ এবং কোম্পানীর সাথে একটা ব্যাবসায়িক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। (See, Wallace, 1992, P.42-43).  পরের বছর বিল গেটস এবং এ্যলেন ট্রাফিক ফ্লো পরিমাপের জন্য নিজেরাই একটি প্রজেক্ট তৈরি করে যেখানে তারা ২০ হাজার ডলার আয় করে। লেক সাইড স্কুলে থাকা কালীন সময়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ স্কুলে রুটিন এবং সিডিউল তৈরি করার জন্য বিল গেটসকে চাকুরীর অফার দেয় ।

 

১৯৭৩ সালের বসন্ত কালে (ফল সেমিস্টার) বিল গেটস হার্ভাড স্কুলের উদ্দ্যেশ্যে ম্যাসাচুসেটস চলে যায়। কিন্তু বিল বুঝে উঠতে পারলো না কি পড়বে বা কি তার পড়া উচিত, প্রথমে সে প্রি- ল’ বা আইন শাস্ত্রের পুরবর্তী ক্লাস নেয়ার ক্লাসে ভর্তি হয়। প্রথম সেমিস্টারে পরীক্ষায় মোটামুটি ভালই করে বিল গেট কিন্তু তার মনতো পড়াশোনায় নেই, বিল তো কম্পিউটারের প্রেমে মগ্ন। বিল কম্পিউটার কোথায় পাওয়া যায় তা খুঁজতে থাকে। হার্ভাডের কম্পিউটার ল্যাব যখন খুঁজে পেল বিল গেটসকে আর পায় কে, সে তো কম্পিউটার প্রেমে হাবুডুবু, কম্পিউটার ল্যাবেই ডুবে গেলো। বিল সারা রাত কম্পিউটার ল্যাবে কাটিয়ে পরদিন সকালে ক্লাসে গিয়ে ঘুমাতো। এদিকে বিল যদিও মেসাচুসেটস রাজ্যের হার্ভাডে আর তার বন্ধু এ্যলেন রয়ে গেল সেই ওয়াশিংটনেই কিন্তু তাদের যোগাযোগ বন্ধ ছিল না। তারা প্রায়শই আলাপ আলোচনা করতো তাদের ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে এবং কিভাবে নিজেদের ব্যাবসা শুরু করা যায়।

                বিল গেটস যখন হার্ভাড ইউনিভার্সিটির প্রথম বছর প্রায় শেষ করছিল সেসময় বিল এবং তার বন্ধু এ্যলেন সিদ্ধান্ত নিল,  এ্যলেন বিল গেটসের কাছে চলে যাবে কারণ তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা দুজন  কাছাকাছি থাকা দরকার। যা ভাবা তাই কাজ সে বছর গ্রীষ্মকালে (সামার) তারা দুজনেই হানিওয়েল কোম্পানীতে চাকুরী নেয়। সে সামারেই তারা তাদের পরিকল্পনাগুলোকে আরো পাকা পোক্ত  করে এবং সামারের শেষেই এ্যলেন বিল গেটসকে চাপ দিতে থাকে যে তারা একটি সফটওয়্যার কোম্পানী চালু করা দরকার। কিন্তু বিল গেটসের জন্য সেটা ছিল কঠিন সময়, বিল ভেবে উঠতে পারছিলনা হার্ভাড ইউনির্ভাসিটি বাদ দিয়ে সফটওয়্যার কোম্পানী খোলা কতটুকু বুদ্ধিমত্তার কাজ হবে এই ভেবে। কিন্তু পরিশেষে তাই হলো, বিল গেটস হার্ভাড ইউনিভার্সিটি ছেড়ে চলে এলো।


মাইক্রোসফটের জন্ম

১৯৭৪ সালে ডিসেম্বর মাস। বেশী দিন আগের কথা নয়। এ কোন রুপ কথার গল্পও নয়। এ ছিল বিশ্বের সেরা ধনীর ধন লাভের এবং কম্পিউটার জগতে এক নব বিপ্লব সাধনের গল্প। বিল গেটসের বন্ধু পল এ্যলেন বিল গেটসের এর সাথে দেখা করতে যাচ্ছিল। পথিমধ্যে এ্যলেন রাস্তায় ম্যাগাজিন দোকানে বিভিন্ন ম্যাগাজিন ঘাটাঘাটি করছিল। হঠাৎ করে এমন কিছু এ্যলেনের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো যা শুধু এ্যলেনই নয়, বা বিল গেটসই নয় সারা বিশ্বের জীবন যাত্রাকে পরিবর্তন করে দিল। একটা প্রসিদ্ধ ইলেক্ট্রনিক ম্যাগাজিনের কভারে অলটায়ার ৮০৮০ (Altair 8080) এর ছবি ছাপা হয়েছিল এবং যে ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হেডলাইন ছিল “World's First Microcomputer Kit to Rival Commercial Models."  

এ্যলেন ম্যাগাজিনটা কিনে নিল। এবং দেীড়ে বিল গেটসের ডর্মের (ছাত্রাবাসের) কক্ষে চলে গেল। দুজনেই বুঝতে পারলো এটাই তাদের জীবন এবং ভাগ্য পরিবর্তনের মোক্ষম সুযোগ। তারা বুঝতে পারলো যে, ঘরে ব্যাবহারযোগ্য কম্পিউটার মার্কেট সহসাই বিস্তার লাভ করবে। এবং এর চাহিদাও বাড়বে প্রচুর আর এই কম্পিউটারগুলোর জন্য সফটওয়্যার এর প্রয়োজন হবে। এর কয়েকদিনের মাথায়ই বিল গেটস অলটায়ার ৮০৮০ মেশিনের প্রস্তুতকারী কোম্পানী এম.আই.টি.এস (Mico Instrumentation and Telemetry Systems),  কোম্পানীকে ফোন করলো। বিল গেটস এম.আই.টি.এস কে বললো যে, সে এবং তার বন্ধু এলেন একটা বেসিক সফটওয়্যার তৈরি করেছে যেটা অলটায়ার ৮০৮০ মেশিনে ব্যাবহার করা যাবে।  কথাটা যদিও ডাহা মিথ্যা ছিল। বিল বা এলেন আসলেই কিছু বানায়নি। তখনো তারা একটি লাইন কোড ও লেখেননি। বিল গেটস এমনভাবে বানিয়ে বললো যে, এম.আই.টি.এস কোম্পানী বিল গেটসের এই বানানো গল্প বিশ্বাস করলো এবং তাদের সেই বেসিক সফটওয়্যারটি দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করলো। এম.আই.টি.এস কোম্পানীর এই আগ্রহ দেখে বিল এবং এলেন কোমর বেঁধে নেমে গেল বেসিক নামক এই সফটওয়্যারটি তৈরিতে। বেসিক নামের কাল্পনিক  নতুন এই সফটওয়্যারের কোড লেখার দায়িত্ব পড়লো বিল গেটসের উপর। এলেনের দায়িত্ব ছিল ডিজাইন এবং সমন্বয় করা। ৮ সপ্তাহ পরে বিল এবং এলেন অনুভব করলো তাদের প্রোগ্রাম তৈরি হয়েছে। এলেনের উপর দায়িত্ব পড়লো এম.আই.টি.এস কোম্পানীতে যাওয়া এবং তাদের নতুন তৈরি করা সফটওয়্যারটি প্রদর্শন করা। এলেন যেদিন গিয়ে পেীছালো সেদিনই বেসিক প্রোগ্রামটি পরীক্ষা করার তারিখ নির্ধারিত ছিল। মজার ব্যাপার ছিল, এলেন যখন তাদের নুতন তৈরি করা বেসিক সফটওয়্যারটি এম.আই.টি. এস কোম্পানীর অলটায়ার ৮০৮০ মেশিনে প্রবিষ্ট করাল সেটাই ছিল এলেনের প্রথম ঐ সফটওয়্যারটি ছুঁয়ে দেখা। অর্থাৎ প্রোগ্রামের কোড তো লিখলো বিল, এলেন অন্য কাজে এত ব্যাস্ত ছিল যে, প্রোগ্রামটা ছুঁয়েও দেখার ফুরসত মেলেনি। যদি এলেনের ডিজাইন পরিকল্পনা কিংবা বিল গেটসের কোড লেখায় কোথাও সামান্যতম ভুল হতো তাহলে সেদিন তাদের সেই সকল প্রচেষ্টা আশার গুড়ে বালি পড়তো। কিন্তু না, প্রোগ্রামটি সত্যি সত্যিই খুব ভালভাবেই কাজ করলো। (Wallace, 1992, p. 80 )

এম.আই.টি.এস কোম্পানী খুব খুশী হয়ে বিল গেটস এবং এলেনের সাথে তাদের নবনির্মিত বেসিক সফটওয়্যারটি ক্রয় চুক্তি করতে রাজী হলো। এক বছরের মধ্যেই বিল গেটস হার্ভাড ইউনিভার্সিটি ছেড়ে দিল এবং মাইক্রোসফট কোম্পানীর জন্ম হলো।

সিয়াটলের রাত

বিল গেটস এর গল্প শেষ করে এবার আবার নিজের গল্পে ফিরে আসি। শুক্রবার মাইক্রোসফট এ আমার প্রোগ্রাম শেষ করে  বিকেল ৩টার দিকে আমি হোটেলে চলে এলাম, একটু ঘুমোলাম। টি.ভি দেখলাম। সন্ধ্যে ৬টার দিকে মফিজ ভাই এলেন আমাকে বাইরে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানোর জন্য। মফিজ ভাই নিয়ে চললেন ওয়াশিংটন শুধু নয়, সারা আমেরিকা এবং সারা বিশ্বের অন্যতম প্রসিদ্ধ পর্বত মালা মাউন্ট রেইনার দেখানোর জন্য। আমি অবশ্য আগে থেকেই মাউন্ট রেইনার সম্পর্কে একটু পড়াশোনা করে রেখেছিলাম সিয়াটলে আসবো বলে। ম্যাপ দেখে নিয়েছিলাম।

আমরা সুন্দর আকাশ আর ফকফকা রোদ নিয়েই বেরুলাম, কিন্তু পর্বতমালার কাছাকাছি আসতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। মফিজ ভাই বললেন এটাই সিয়াটলের স্বাভাবিকতা। আরেকটু দুরে যেতে না যেতে বা অন্য অর্থে পর্বতমালার সীমানা পার হতেই বৃষ্টির মাত্রাও কমে গেল। আবার সেই রোদ, কোথাও আবার কুয়াশাচ্ছন্ন বিকেল। মফিজ ভাই পাহাড়ি ঝরনার কাছে নিয়ে গেলেন। এমন মনমুগ্ধকর মনোরম পরিবেশ ছিল যে, আমি ক্রমেই যেন হারিয়ে যেতে লাগলাম প্রকৃতির অপরুপ সেীন্দর্য্যে।

 

রাত আনুমানিক ৮টার দিকে আমরা পাহাড়ী ঝরনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিকটস্থ ছোট্র শহরতলীর দিকে যাত্রা করলাম। একেবারে নিতান্তই ছোট্র শহর, সিয়াটলের পাহাড়ের পাদদেশের ছোট শহর, কেন যেন অপরুপ সুন্দরী মনে হচ্ছিল।

সবচে’ মজার ব্যাপার ছিল, রাত তখন ৮টা, সবকিছু অন্ধকার বা রাতে আমেজ থাকলেও পাহাড় চুড়া কিন্তু অপরুপ রংয়ে রঙীন, একদিকে সাদা বরফ, তার উপর বিদায়ী সুর্য্যরে চিকচিকে রোদ এবং লালিমা, আহা কত সুন্দর। মনে হলো  কবির কাব্য ”নিখিলের এত শোভা, এত রুপ, এত হাসি গান।” রাত আনুমানিক ১০টায় হোটেলে ফিরলাম।

 

পরদিন শনিবার , রওয়ানা করলাম সিয়াটলের রাজধানী অলিম্পিয়াতে। অলিম্পিয়াতে থাকতেন  নজরুল ভাই।

 
 
 

Recent Posts

See All
এখানে মিষ্টি বিক্রি হয়।

ঈশপের  সেই বিখ্যাত গল্পটি দিয়েই আজকের সম্পাদকীয়টা শুরু করা যাক।  এক বয়স্ক পিতা বাজারে যাবেন এতে তাঁর কিশোর ছেলে বায়নাধরেছে সেও বাবার সাথে...

 
 
 

Comments


Contact

Never Miss a Lecture

Add your text

  • Linkedin
  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • YouTube
  • Amazon
White Structure

Never Miss a Lecture

Add your text

_London trip in Bangla.pdf

bottom of page