সূর্যোদয়ের দেশে
- AbuSayed Mahfuz
- Aug 16, 2025
- 6 min read
সূর্যোদয়ের দেশ বলতে আমরা জাপানকে চিনি। আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা জাপানকে কেন সূর্যোদয়ের দেশ বলে হবে। জাপান একটি অর্থশালী প্রভাবশালী দেশ বলেই কিনা জানিনা। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অনুযায়ী অষ্ট্রেলিয়া মহাদেশের ছোট্ট দ্বীপ ফিজিই সর্বপ্রথম সূর্যের মুখ দেখার কথা। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার ঠিক সাথে লাগানো এই ছোট্ট দ্বীপটিই সর্বপ্রথম সূর্যের মুখ দেখে, তারপর অকল্যান্ড।
গ্রীনিচ মান সময়ানুযায়ী ফিজি এবং অশল্যান্ডের ৩ ঘন্টা পর জাপান সূর্যের মুখ দেখে। তাই আপাতঃ আজকের এই পরিসরে আমি জাপানকে সূর্যোদয়ের দেশ ধরে নিচ্ছি না। তাই বলে এখানে আমি ফিজে বা অকল্যান্ডে ও বুঝাচ্ছি না। জাপানকে যেমন গায়ের জোরে সূর্যোদয়ের দেশ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছে আমিও তেমনি একটু গায়ের জোর খাটাচ্ছি। আমার এ লেখা কোন তাত্ত্বিক বিশেষণ নয়, স্রেফ ভ্রমণ কাহিনী।
আমার আজকের বলার বিষয় মালয়েশিয়ার একটি পরিচিত এবং আলোচিত রাজ্য কেলানতানের পূর্ব পার্শ্বের দক্ষিন চীন সাগরের পশ্চিম তীরকে নিয়ে। মালয়েশিয়ার কেলানতান রাজ্যের দক্ষিন চীন সাগরের এই পশ্চিম তীরকেই আমি আজ সূর্যোদয়ের দেশ বলে চালিয়ে দিচ্ছি। তবে আমার দাবীর পেছনে যুক্তিও আছে। হ্যাঁ ম্যাপটা খুলে বসুন, চলে আসুন মালয়েশিয়ায়, তারপর কেলানতানে, এর পর আসুন পূর্ব সীমানায় চীন সাগরের তীরে। তারপর সোজা নজর দিন পূর্ব দিকে দেখবেন চীন সাগর, সুলু সাগর পেরিয়ে ফিলিপাইনের মিন্ডানাও দ্বীপ এবং বোহেল দ্বীপের মাঝে যে সোজা সাগর গলিপথ আছে তা দিয়ে বরাবর চলে যেতে পারবেন পূর্ব দিকে একেবারে সূর্যের ত্রিসীমানায়। কি বুঝলেন? কেলানতানকে সূর্যোদয়ের দেশ বলা যায় কি? অন্ততঃ আপাততঃ।
থাক ওসব তাত্বিক বিশ্বেষণে গিয়ে লাভ নেই আমার কথা হলো আমি চীন সাগরের পাড় থেকে সূর্যোদয় দেখেছি। যেদিন আমি কেলানতান যাবার পরিকল্পনা নিয়েছি সেদিনই কেলানতানের বন্ধুটি বলল, তার বাড়ী চীন সাগর থেকে মাত্র ২০০ মিটার হবে। পরম আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। পৃথিবীর পূর্ব মাথা থেকে সূর্যোদয় দেখব, উফ, কি মজা। রমজানের ছুটিতে কেলানতান গেলাম সাগর পাড় থেকে সূর্য়োদয় দেখব।
১১ই মার্চ শুক্রবার আমরা কেলানতান পৌঁছি। আমরা না বলে আমিও বলতে পারি কারণ আমার সাথে আমি ছাড়া বিদেশী আর কেউ ছিল না। আর এ ব্যাপারে যে আমাকে পরম আন্তরিকতার সাথে সহযোগিতা করেছিল আমার বন্ধু আদনান। যার কাছে সত্যিই আমি কৃতজ্ঞ। তার এবং তার পরিবারের সর্বোচ্চ সহযোগিতা আমি পেয়েছিলাম। ১১ তারিখ বিকেলেই আদনান আমাকে বলল, তুমি কি সাগর তীরে যেতে পছন্দ করবে নাকি এক অজ পাড়া গা’তে যাবে আজ। কাল না হয় সাগর তীরে যাব। বললাম, তাই হোক। ১১ মার্চ বিকেলে আমরা পল্লী গাঁয়ে গেলাম। সেই যেন বাংলার ধানক্ষেত। এই যেন বাংলার কৃষক, কোন ফারাক নেই। সমান মানুষ। তামাটে রংয়ের দেহ। পার্থক্য এতটুকু একজন অন্য জনের কথা বুঝে না। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো সেই ধানক্ষেত পাঠক্ষেতের মাঝের রাস্তাও কিন্তু পাকা করা। একবার মাঠের মাঠে একদল কৃষক দেখে আদনানকে মোটর সাইকেল থামাতে বললাম, রাস্তায় মোটর সাইকেল দাঁড় করিয়ে এগিয়ে গেলাম দুজনেই ক্ষেতের আল ধরে। কৃষকরা তাকালো আমাদের দিকে, আমাদের দেশেও দেখেছি কোন মোটর সাইকেলধারী ক্যামেরা ওয়ালা লাল চামড়া ওয়ালাকে ধান ক্ষেতের দিকে এগিয়ে আসতে দেখলে কৃষকরা তাকিয়ে থাকে। এগিয়ে গেলাম তাদের কাছে কৃষকরাও হাতের কাজ থামিয়ে এগিয়ে এল। আদনান মালয় ভাষায় কি কি যেন বললেন, যৌবনের কাছাকাছি বয়েসী একজন আমার সাথে ইংরেজীতে কথা বলতে চেষ্টা করলো, আমার মালয় ভাষা-জ্ঞানের দৌড় যদ্দুর তার ইংরেজীতে দখলও তদ্দুর। তার সাথে বেশী দূর কথা বলতে পারলাম না। তবুও গ্রামের একজন কৃষক সামান্য পড়ালেখা করে যতটুকু সাহস করেছে তা অনেক বেশী।
তাদেরকে নিয়ে আমরা ছবি তুললাম, তারা তো মহাখুশী। বিশেষতঃ যখন বলা হলো এ ছবি পত্রিকায় ছাপা হবে।
নানা কারণে প্রথম দিনেই আমার সাগর পাড়ে যাওয়া হয়নি। আদনানের বাড়ী থেকে সাগর ৮/৯ কিলোমিটার। কথা ছিল সাগরের ঠিক তীরে যে বন্ধুটির বাড়ী, তার বাড়ী গিয়ে ২ দিন থেকে রাত কাটাব, আর সকালে সূর্যোদয় দেখব। আর মাত্র ২ রাত আমি কেলানতানে থাকছি। তারপরই কুয়ালামপুরের দিকে যাত্রা। ১৪ মার্চ সোমবার যেভাবেই হোক সাগর পাড়ের বন্ধুটির বাড়ী যেতে হবে। না হয় সূর্যোদয় দেখা হবে না। সাগর পাড়ের বন্ধুর নাম আজহাম। ১৪ মার্চ রাত ৯ টা। আমি সিরিয়াস হয়ে গেলাম। এখনই সময় এ দু’রাত যদি সাগর পাড়ে না যেতে পারি তাহলে কেলানতানে আসাটাই মাটি।
রাত আছে মাত্র ২ টা। এক সকালে তো আকাশ মেঘলাও থাকতে পারে। আদনান এর আম্মা বললেন, ৪ টা ভাত খেয়েই যেতে হবে। হয়ত বা আদনানদের বাড়িতে এটাই হবে শেষ ভোজন। খাওয়ার পর্ব শেষ হলো, কিন্তু বাইরে বৃষ্টি। এ বৃষ্টিতে বেরুনোর কোন যুক্তি হয় না। কিন্তু আমার মুখভঙ্গি দেখে আদনান কোন প্রতিবাদ না করে বৃষ্টিতেই বের হয়ে পড়ল। গায়ে ওভারকোট মাথায় হেলমেট বেঁধে আদনান মোটর সাইকেল স্টার্ট দিল। আমি পেছনে বসে পড়লাম। আধা মাইলও যেতে পারিনি ভিজে একাকার হয়ে গেলাম। আদনান এক বাজারে থামল। বলল, আজহামকে ফোন করি। করলাম ফোন কিন্তু আজহাম বাসায় নেই। তার ছোট বোন ধরল, সে কোন এক স্থানে গিয়েছে বলল, আমরা সেখানে গেলাম কিন্তু সেখানে আজহাম নামে কাউকে আমরা পেলাম না। ইতিমধ্যে দেখলাম আমার সারা শরীর তো ভিজে গেছেই বেশ দামে কেনা অত্যন্ত শখের জুতাও ভিজে যাচ্ছে। নিজের শরীর জামা কাপড় ভিজেছে, জ্বর আসতে পারে সে জন্য দুঃখ নেই। কিন্তু জুতাটা ভিজছে দেখে কষ্ট লাগলো। ব্যাগ খুললাম, কাপড়ের জুতা বের করে পরলাম, শখের জুতাটা ব্যাগে ভরলাম। আবার শুরু করলাম যাত্রা। সূর্যোদয় দেখতে আবার অভিলাষ। রাত প্রায় ১০ টার দিকে আমরা আজহামদের বাড়ীর কাছে পৌঁছলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজহাম এখনো ফিরেনি। আর তাদের বাড়িতে আর কোন মেহমান ধারণের ক্ষমতাও নেই। তার বিবাহিতা বোনেরা বেড়াতে এসেছে। সুতরাং গো ব্যাক, আদনান বলল চিন্তা করনা আমার বাড়ী চল আবার, তোমাকে কাল ভোর রাতে আবার নিয়ে আসব, তুমি চিন্তা করো না। সূর্যোদয়ের অনেক আগেই আমরা সাগর পাড়ে পৌঁছব।
ফিরে এলাম আদনানদের বাড়ীতে। রাত তখন ১১ টা। প্রায় সকলেই ঘুমে অচেতন। আমরাও প্রচন্ডভাবে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার জেগেও গেলাম ভোর রাতে। আদনানকে জাগাতে খারাপ লাগছিল তাকে আর কত কষ্ট দেব। ইতোমধ্যে সে নিজেই জেগে গেছে। বলল, দেরি করনা। আবার সেই ভোঁ দৌড়। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল মোটর সাইকেলে তেল নেই। গত রাতেই তেল শেষ হয়ে যাবার পর রিজার্ভ এ দিয়ে দেখা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে এতক্ষণে রিজার্ভ জ্বালানীও শেষ হয়ে গেছে। আর এই পল্লী গাঁয়ে কোন ক্রমেই এই ভোর রাতে জ্বালানী পাওয়া যাবে না। মনে মনে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়লাম। এতে ভাবলাম এত বাধা ডিঙ্গিয়ে কি কাজ করা যায়? নিজের উপর কিছুটা ধিক্কার এল। মনে মনে আল্লাহকে বললাম, প্রভু আমরা তো কোন অন্যায় কাজে যাচ্ছি না। আমি মনে মনে অপেক্ষা করছিলাম, হঠাৎ কখন মোটর সাইকেলটা বন্ধ হয়ে যায়। আমার মুখ পাংশু বর্ণ হয়ে পড়লো। আল্লাহ একটু সাহায্য করো, এত টাকা খরচ করে কেলানতান এলাম, যদি সেই সূর্যোদয়ই না দেখলাম তাহলে সব মাটি, জীবনে তো আর কখনো আসার সুযোগ নাও হতে পারে।
মানুষ যখন একান্ত মনে আল্লাহর কাছে কিছু চায় আল্লাহ তা পূরণ করেন। একজন নিতান্ত যুক্তিবাদী বা বস্তুবাদীর দৃষ্টিতে এটা অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তবু মনের শক্তিকে কোন দর্শনই অস্বীকার করতে পারে না। সে যাক, আমাদের ক্ষেত্রে কিছুটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল।
আমরা সাগর তীরের পাকা রাস্তায় মোটর সাইকেল থামিয়ে বালুচর দিয়ে সাগরের দিকে এগিয়ে গেলাম। পূর্বাকাশের কালিমা ক্রমেই টকটকে রং ধারণ করছে। সামান্য একটু মেঘও আছে, কিন্তু সে মেঘটাও বিরাট শিল্পের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোলা লাল আকাশের এখানে ওখানে দু/এক চিলতে মেঘ পরম ছন্দের সৃষ্টি করেছে। আমি আবেগে নিজিকে হারিয়ে ফেলতে লাগলাম। সুন্দর। উফ্ বড়ই সুন্দর। এর চেয়ে বেশী কিছু বলার মত ভাষা আমার নেই। আমার মনে পড়লো গানের সেই কলি “তোমার সৃষ্টি যদি হয় এত সুন্দর না জানি তাহলে তুমি কত সুন্দর”। আদনানকে বললাম মনের মত করে ছবি তুলতে। সে আমার ছবি তুলতেই ব্যস্ত। তার ছবি তোলার জন্য বার বার বললে সে না না করলো। হয়তো বা আজকের এই সুযোগ সে শুধু আমাকেই দিতে চাইছে। সে তো জীবনে অনেকবার আসতে পারবে কিন্তু আমি তো কোন দিন আর আসতে পারবো না। তবুও তার ২/৪ টা ছবি নিলাম।
এক সময় বললাম আমার এই স্মৃতি বিজড়িত স্থানে দু’জনে একত্রে ছবি তুলতে চাই। আমাদের একটু দূরে কিছু লোক আছে তাদের একজনকে অনুরোধ করবো একটা ছবি তুলে দিতে। আমি সতর্কতা হিসেবে আদনানকে বললাম, দেখ সাগর পাড়ে নাকি এমন এমন ঘটনা ঘটে যে তুমি কাউকে তোমার ক্যামেরা দিয়েছ একটা ছবি তুলে দিতে। সে তখন ক্যামেরাটা নিয়ে ভোঁ দৌড়। আমার এ কথায় আদনান কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, মালয়েশিয়ায় কখনো এরকম ঘটনা ঘটেনা।
মালয়েশীয়দের কাছে তুমি কখনো এমনটি প্রত্যাশা করতে পার না। আমি এতে কিছুটা লজ্জা পেয়ে বললাম, “ সরি ব্রাদার” সত্যিই মালয়েশিয়াতে এমন ঘটনা সচরাচর ঘটার কথা নয়, অন্তত মালয়দের দ্বারা। অন্য দোষগুন যাই থাক, ঝগড়াঝাটি আর প্রতারণা বিশ্বাসঘাতকতা মালেদের মধ্যে পাওয়ার কথা নয়।
যে ভদ্রলোক আমাদের ছবি তুলে দিলেন তিনি আমরা যতদূর আশা করেছিলাম তার চে’ বেশী ভাল মানুষ। আমরা আই, আই, ইউ, এর ছাত্র শুনে ভদ্রলোক খুশী হলেন। তিনি আই, আই, ইউ, এর এক ছাত্রাবাসের কাছের এক অফিসে চাকুরী করেন। তাই আলাপ জমল কিছুক্ষন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইলেন।
সাগর পাড় থেকে ফিরে পাশ্ববর্তী বাজারে গিয়ে আদনানকে বললাম, নাস্তা করা দরকার। সে বলল, ওক আমি বললাম, আমাদের নাস্তার পয়সাটা আমিই পে করব। সে হেসে বললো, “তোমার খুব ইচ্ছা?” আমি বললাম, হ্যাঁ। বলল ঠিক আছে। আমি মনে মনে বড় অংকের একটা বিলের প্রত্যাশা করছিলাম। কারণ ভালো মানের নাস্তা ছাড়াও সমুদ্র সৈকত হিসেবে চড়াদাম নিতে পারে। কিন্তু আমি মনে মনে সে বিলের জন্য প্রস্তুত ছিলাম তার চে’ অনেক কম বিল আসল, কেন্টিনে বসে চোখ পড়ল একটা বিরাট সাইনবোর্ড। মালয় ভাষায় লেখা। আদনান বললো, জান এখানে কি লেখা রয়েছে? সে বলল, এই সাইনবোর্ড দিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করা হয়েছে। এই সাইন বোর্ডে দিয়ে পর্যটকদের সর্তক করা হয়েছে। এই সাইন বোর্ডে লেখা রয়েছে, “যারা অযথা সময় নষ্ট করে আল্লাহ তাদেরকে পছন্দ করেন না।”
বেলা সাড়ে ১০ টার দিকে আমরা সূর্যোদয়ের দেশ থেকে ফিরে চলে এলাম। বিদায় কেলানতান, বিদায় চীন সাগর।





Comments